– – 

– – 

চট্টগ্রাম কলেজের মেধাতালিকায় এক পরিবারের হ্যাটট্রিক!

সময় ১৯৯৫ সাল। এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল চট্টগ্রাম কলেজের তরুণ শিক্ষার্থী শেখ মোহাম্মদ জুলফিকারের ঘরে। তৎকালীন কুমিল্লা বোর্ডের মেধাতালিকায় মানবিক বিভাগ থেকে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছিলেন তিনি।

ঘড়ির কাঁটা ঘুরে আজ পেরিয়ে গেছে ঠিক ৩১টি বছর। ২০২৬ সালে এসে সেই একই আনন্দ, একই উত্তেজনা আরও দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এল জুলফিকারের পরিবারে। তবে এবার আর নিজের জন্য নয়, মেয়ে শেখ নাফসান ইউসরার হাত ধরে।

মজার ব্যাপার হলো, বাবার সেই অর্জনকেই যেন হুবহু ফিরিয়ে আনলেন মেয়ে। বাবার মতোই চট্টগ্রাম কলেজ থেকে, সেই মানবিক বিভাগেই এবং বোর্ডের মেধাতালিকায় ঠিক চতুর্থ স্থানটিই নিজের করে নিয়েছেন মেয়ে নাফসান ইউসরা।

bKash

সদ্য প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে চট্টগ্রাম বোর্ডে ১ হাজার ১৪৮ নম্বর পেয়ে চতুর্থ হয়েছেন নাফসান ইউসরা। বাবা ও মেয়ের মেধাক্রমের এমন কাকতালীয় মিল যে-কাউকেই অবাক করবে। তবে এই পরিবারের সাথে চট্টগ্রাম কলেজের মেধার সম্পর্ক শুধু বাবা আর মেয়েতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর শেকড় প্রোথিত আরও গভীরে।

জানা যায়, মেধার এই রিলে রেসের শুরুটা হয়েছিল আজ থেকে ৬৪ বছর আগে, ১৯৬২ সালে। পরিবারের প্রথম প্রজন্ম হিসেবে সে বছর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে মেধাতালিকায় নাম লিখিয়ে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছিলেন সৈয়দ রেজাউল হায়াত। সম্পর্কে তিনি নাফসানের দাদা (বাবা শেখ মোহাম্মদ জুলফিকারের মেজ মামা)।

চট্টগ্রাম কলেজের সেই সাফল্যের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সৈয়দ রেজাউল হায়াতের। মেধার স্বীকৃতি হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তানের মর্যাদাপূর্ণ ‘ইন্টার-উইং স্কলারশিপ’ নিয়ে তিনি পাড়ি জমান পশ্চিম পাকিস্তানে। সেখানে লাহোর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে বিএ (অনার্স) এবং এমএ; উভয় পরীক্ষাতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে অসামান্য কীর্তি গড়েন তিনি।

দাদা সৈয়দ রেজাউল হায়াতের গড়ে দেওয়া সেই মেধার ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই ১৯৯৫ সালে নিজের সাফল্যের গল্প লিখেছিলেন বাবা শেখ মোহাম্মদ জুলফিকার। আর ২০২৬ সালে এসে সেই একই কলেজের আঙিনা থেকে বাবার রেকর্ড ছুঁয়ে মেধার ব্যাটনটি নিজের হাতে তুলে নিলেন তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি শেখ নাফসান ইউসরা।

দাদা ও বাবার স্মৃতিবিজড়িত কলেজ থেকে এমন অভাবনীয় সাফল্যের পর উচ্ছ্বসিত শেখ নাফসান ইউসরা।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে নাফসান বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাসায় বাবার কাছে দাদার সাফল্য আর চট্টগ্রাম কলেজের গল্প শুনে বড় হয়েছি। এই কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই মনে একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল, আমিও তাঁদের মতো ভালো কিছু করব। তবে বাবার মতোই বোর্ডে ঠিক চতুর্থ স্থানটি অর্জন করব, তা কখনো ভাবিনি! পরিবারের এই ঐতিহ্যের ধারা ধরে রাখতে পেরে ভীষণ ভালো লাগছে। শিক্ষক ও বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণা ছাড়া এই ফলাফল সম্ভব হতো না।

মেয়ের এমন অর্জনে আবেগাপ্লুত বাবা শেখ মোহাম্মদ জুলফিকারও। ৩১ বছর আগের স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ১৯৯৫ সালে আমি যখন চট্টগ্রাম কলেজ থেকে কুমিল্লা বোর্ডে চতুর্থ হয়েছিলাম, তখন আমাদের পরিবারে যে আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল, আজ মেয়ের ফলাফলে ঠিক সেই একই অনুভূতি ফিরে এসেছে।

আমার মেজ মামা সৈয়দ রেজাউল হায়াত ১৯৬২ সালে এই কলেজ থেকে মেধাতালিকায় স্থান করে আমাদের যে পথ দেখিয়েছিলেন, নাফসান আজ তৃতীয় প্রজন্মে এসে সেই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখল। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! আমি চাই ও যেন সামনে আরও বড় হয় এবং মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশের সেবা করে।

১৯৬২, ১৯৯৫ আর ২০২৬; মাঝখানে পেরিয়ে গেছে ছয় দশকেরও বেশি সময়। বদলে গেছে রাষ্ট্রের মানচিত্র, শিক্ষা বোর্ড আর পরীক্ষার নম্বর দেওয়ার ধরনও। কিন্তু চট্টগ্রাম কলেজের মেধাতালিকায় এই পরিবারের নাম লেখানোর ধারাবাহিকতায় যেন এতটুকুও ছেদ পড়েনি। দাদা সৈয়দ রেজাউল হায়াতের দেখানো পথ ধরে বাবা শেখ মোহাম্মদ জুলফিকার, আর বাবার হাত ধরে মেয়ে শেখ নাফসান ইউসরা; তিন প্রজন্মের এই অনন্য সাফল্য ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজের ইতিহাসেও হয়ে থাকল এক উজ্জ্বল ও অনুপ্রেরণাদায়ী অধ্যায়।