– 

– 

পাহাড়ের মানুষের চোখে আলো ফেরাতে মানবিক উদ্যোগ

পাহাড়ের দুর্গম পথ পেরিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া অনেকের কাছেই সহজ নয়। বিশেষায়িত চিকিৎসা তো আরও দূরের বিষয়। চোখের সমস্যা নিয়ে বছরের পর বছর কষ্ট সহ্য করা, ঝাপসা দৃষ্টিকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া—পানছড়ির প্রত্যন্ত এলাকার অনেক মানুষের কাছে সেটিই ছিল বাস্তবতা।

সেই বাস্তবতায় একদিনের জন্য হলেও স্বস্তির বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছিল চিকিৎসাসেবা। খাগড়াছড়ির পানছড়িতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে আয়োজিত দিনব্যাপী বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পে একসঙ্গে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬০০ মানুষ। চোখ পরীক্ষা, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় ওষুধের পাশাপাশি অনেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বিনামূল্যের চশমা।

খাগড়াছড়ি রিজিয়নের আওতাধীন খাগড়াছড়ি জোনের উদ্যোগে উপজেলা মডেল মসজিদ কমপ্লেক্সে আয়োজিত এ ক্যাম্পে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতায় ছিল রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং পোর্ট সিটি, রোটারাক্ট ক্লাব অব চিটাগাং লেক সিটি, চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশন এবং লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং প্রোগ্রেসিভ সাউথ।

ক্যাম্পে প্রধান অতিথি ছিলেন খাগড়াছড়ি জোনের জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুর রহমান, পিএসসি।

সকাল থেকেই ক্যাম্পে আসতে শুরু করেন নানা বয়সী মানুষ। কারও চোখে দীর্ঘদিনের ঝাপসা দৃষ্টি, কারও চোখে ছানির সমস্যা, আবার কেউ চোখের নানা জটিলতা নিয়ে হাজির হন চিকিৎসকের কাছে। দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার সুযোগটি তাই হয়ে ওঠে বিশেষ স্বস্তির।

দিনব্যাপী ক্যাম্পে মোট ৬০০ জন রোগীকে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২১৭ জন রোগীর মধ্যে বিনামূল্যে চশমা বিতরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ যাদের চোখের দৃষ্টিকে আরও পরিষ্কার করতে একটি চশমাই যথেষ্ট, তাদের অনেকের জন্য সেই চশমাটিও এসেছে বিনা খরচে।

তবে সবার সমস্যা এতটা সহজও ছিল না। ছানিপড়া ও অন্যান্য জটিল চক্ষু সমস্যায় আক্রান্ত ১৫৫ জনকে উন্নত চিকিৎসা ও ছানি অস্ত্রোপচারের জন্য চট্টগ্রামের লায়ন্স চ্যারিটেবল আই হসপিটাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটে রেফার করা হয়েছে। তাদের চিকিৎসা ব্যয় খাগড়াছড়ি জোনের পক্ষ থেকে বহন করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।

ক্যাম্পে রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং পোর্ট সিটির পিপি ইঞ্জিনিয়ার মোরশেদ আলম, চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সৌমেন তালুকদার, ডা. শুভ চক্রবর্তী এবং ক্যাম্প কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন খাগড়াছড়ি জোনের রেজিমেন্টাল মেডিকেল অফিসার ক্যাপ্টেন তানজিম, এএমসি।

আয়োজকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল মানুষের জন্য বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষা, ওষুধ, চশমা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের সুযোগ তাদের চিকিৎসার ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

চিকিৎসা নিতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা, সমাজকর্মী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও উদ্যোগটির প্রশংসা করেন। তাদের ভাষায়, শহরের হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য বা সুযোগ যাদের নেই, তাদের কাছে নিজ এলাকায় এমন বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাওয়া অনেকটা আশীর্বাদের মতো।

একজন মানুষের কাছে চোখের দৃষ্টি শুধু দেখার ক্ষমতা নয়; এটি তার কাজ, চলাফেরা, পরিবার ও স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত। তাই একটি চশমা কখনো কখনো হয়ে উঠতে পারে নতুন করে স্পষ্ট পৃথিবী দেখার সুযোগ। আবার একটি সফল ছানি অস্ত্রোপচার ফিরিয়ে দিতে পারে বহুদিনের হারানো আলো।

পানছড়ির এই ক্যাম্পে সেই আলো ফেরানোর চেষ্টাই দেখা গেছে। চিকিৎসকের পরামর্শ, হাতে ওষুধ, কারও হাতে নতুন চশমা—আর গুরুতর রোগীদের জন্য সামনে উন্নত চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি ও জনকল্যাণে বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থা ও সুসম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের চিকিৎসা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।