– 

– 

মনে পড়ে সেই ‘রেড কাউ’—চট্টগ্রামে নতুন দামে ফিরছে নব্বই দশকের নস্টালজিয়া!

‘মনে পড়ে, মনে পড়ে ফেলে আসা সেই সুন্দর দিনগুলো…’— এক সময় টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠত এই পরিচিত সুর। ‘ছোট্ট ছোট্ট কত কথা, ভালোবাসায় ভরপুর। আর মনে পড়ে রেড কাউ, পরিবারে পুষ্টির বন্ধন রেড কাউ।’

নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে এটি শুধু জনপ্রিয় টেলিভিশন বিজ্ঞাপনই ছিল না, ছিল দুরন্ত শৈশব-কৈশোরের এক টুকরো অমলিন স্মৃতি।  সুরেশ ওয়াডকরের কণ্ঠে পরিবেশিত চমৎকার সেই জিঙ্গেল আজও অনেকের মনে দোলা দেয়। পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানো কারও কর্ণকুহরে এ সুর প্রবেশ করলে মুহূর্তেই তিনি হারিয়ে যান ফেলে আসা সেসব দিনগুলোতে।

বলা যায়, টেলিভিশনের পর্দায় বাজতে থাকা সেই সুর, পরিবারের সঙ্গে বসে বিজ্ঞাপন দেখা আর ঘরের রান্নাঘর কিংবা ডাইনিং টেবিলে রেড কাউ-এর টিনের কৌটা; সব মিলিয়ে একটি প্রজন্মের স্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল এ রেড কাউ।

আজ ফেলে আসা সেই দিনগুলোর স্মৃতি যেন আবারও ফিরে এলো চট্টগ্রামে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে। পুরোনো সেই ব্র্যান্ড ‘রেড কাউ’ এবার নতুন দামে, আকষর্ণীয় নতুন প্যাকেজে এবং নতুন বিপণন কৌশলে দেশের বাজারে ফিরছে। সময়ের স্রোতে একসময় বাজার থেকে অনেকটা আড়ালে চলে গেলেও চট্টগ্রামের মানুষকে সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য-স্মৃতির মুখোমুখি করতে নতুন উদ্দীপনা, সর্বোচ্চ পুষ্টিগুণ এবং সাশ্রয়ী মূল্য নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন যাত্রা শুরু করেছে ব্র্যান্ডটি।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) নগরের ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম ক্লাবের ফ্যামিলি ডাইনিং হলে নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টস্ বাংলাদেশ লিমিটেডের উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ স্বনামধন্য পণ্যটি নতুনভাবে বাজারজাতকরণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

কোম্পানির এসআর ও ডিস্ট্রিবিউটরদের নিয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উঠে আসে পণ্যের বৈশিষ্ট্য, নতুন মূল্য, বিপণন পরিকল্পনা এবং পরিবেশক-খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার নানা উদ্যোগ ও কৌশল।

ছবি: চট্টগ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে লঞ্চ হলো ‘রেড কাউ’

হারিয়ে যাওয়া সেই ‘রেড কাউ’কে ফিরিয়ে আনার গল্প

নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টস্ বাংলাদেশ লিমিটেডের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) আসিফুর রউফ যেন অনুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থিত সবাইকে ফিরিয়ে নিলেন সেই পুরোনো দিনে। ‘মনে পড়ে, মনে পড়ে’—সেই বিজ্ঞাপনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একসময় বাংলাদেশে দুধের গুঁড়ার বাজারে রেড কাউ, ডানো ও অ্যাংকর ছিল পরিচিত নাম। তখন দুধ আসত টিনের কৌটায়, আর রেড কাউ ছিল বেশ জনপ্রিয়। পরে বিভিন্ন কারণে এ দুধটা আস্তে আস্তে হারিয়ে গেছে। ওই হারিয়ে যাওয়া রেড কাউকে আমরা এখন ফেরত নিয়ে আসতেছি। সরাসরি নিউজিল্যান্ড থেকে প্যাকেটজাত হয়ে আসা রেড কাউ নতুনভাবে বাজারে দেওয়া হচ্ছে। এটা অরিজিনালি নিউজিল্যান্ডের প্রোডাক্ট। আমরা সরাসরি নিউজিল্যান্ড থেকে এ দুধ নিয়ে আসছি। বাংলাদেশে এনে তাতে নতুন কিছু যোগ করছি না।

২৮.৪% মিল্ক ফ্যাট এবং সাশ্রয়ী মূল্য

অনুষ্ঠানে রেড কাউ-এর  বড় আকর্ষণ হিসেবে সামনে আনা হয়েছে এর দুধের ফ্যাটের পরিমাণ এবং দাম। কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে রেড কাউ-এর ৫০০ গ্রামের প্যাকেটের দাম ৪৬০ টাকা, আর ১ কেজির প্যাকেটের দাম ৯১০ টাকা। আসিফুর রউফের দাবি, বাজারের কিছু প্রচলিত ব্র্যান্ডের তুলনায় রেড কাউ-এর দাম তুলনামূলক কম। বাজারের অন্যান্য কিছু দুধে যেখানে মিল্ক ফ্যাট ২৬ শতাংশের মতো, রেড কাউতে রয়েছে ২৮.৪ শতাংশ। পাশাপাশি এটি দ্রুত পানিতে মিশে যায়।

সাধারণ ক্রেতা কেন অন্য ব্র্যান্ড বাদ দিয়ে রেড কাউ কিনবেন— ট্রেড প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বেশি ফ্যাট, ইনস্ট্যান্ট বৈশিষ্ট্য, প্রিমিয়াম মান এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী দাম;এই চারটি বিষয়ই রেড কাউ-এর মূল শক্তি। এ সময় তিনি বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ডের তুলনায় রেড কাউ-এর মানের অন্যান্য শ্রেষ্ঠত্বের গল্পও তুলে ধরেন।

ছবি: বক্তব্য রাখছেন সিএমও আসিফুর রউফ

গরুর দুধের মতো হলুদাভ

রেড কাউ-এর দুধের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়েছে এর রঙ। এ প্রসঙ্গে আসিফুর রউফ বলেন, দুধটি হবে হলুদাভ। গরুর দুধের মতো হলুদ। এবং এতে গরুর দুধের মতোই সব গুণাগুণ থাকবে। প্যাকেটটিও তৈরি করা হয়েছে আকর্ষণীয়ভাবে। নতুন প্যাকেজে ব্র্যান্ডটির পুরোনো পরিচিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক ডিজাইনের ছোঁয়া। অর্থাৎ ফিরে আসা রেড কাউ শুধু পুরোনো স্মৃতিকে ধারণ করছে তা নয় বরং বর্তমান প্রজন্মের ভোক্তার কাছেও নতুনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে চাইছে।

শহরের পাশাপাশি গ্রামেও

রেড কাউ-এর নতুন এই যাত্রার লক্ষ্য শুধু শহরের বাজার নয়, গ্রামেও বিক্রি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টস্ বাংলাদেশ লিমিটেডের হেড অব সেলস হামিদ খান বলেন, রেড কাউ একটি হেরিটেজ ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেটের মানুষ রেড কাউ-এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত এবং তাদের কাছে ব্র্যান্ডটির ভালো মানের একটি ধারণা রয়েছে।

তিনি বলেন, আগে রেড কাউ-এর মাত্র দুটি প্যাক ছিল। এখন ছয়টি প্যাক বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ২০০, ৪০০ ও ৫০০ গ্রামের প্যাক রয়েছে। ১ কেজির প্যাকটি প্রায় দুই মাস পর বাজারে আসবে আর অন্যান্য প্যাক চলতি মাসেই বাজারজাত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ দুধের বিশেষত্বের জায়গা হলো এর ক্রিম বা ফ্যাটের পরিমাণ। এতে ২৮.৪ শতাংশ ফ্যাট রয়েছে।

সম্পর্কটা হোক আরও গাঢ়

একটি ব্র্যান্ড শুধু হাঁকডাক দিয়েই বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না। এক্ষেত্রে প্রয়োজন দোকানদার, ডিস্ট্রিবিউটর ও ভোক্তার সঙ্গে গভীর-সুন্দর সম্পর্ক। সেই কথা বিবেচনা করে রেড কাউ- এর এবারের বিপণন পরিকল্পনাতেও গুরুত্ব পেয়েছে সম্পর্কের বিষয়টি। সম্পর্কটা হোক আরও গাঢ়, এই বার্তাকে সামনে রেখে দুই কেজি রেড কাউ–এর সঙ্গে দোকানদারদের একটি করে টি-শার্ট দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান কোম্পানির কর্মকর্তারা। এবং পাশাপাশি শুরু হয়েছে ডিজিটাল ক্যাম্পেইন। রবির অ্যাপেও থাকছে বিশেষ আকর্ষণ। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য প্রচারমাধ্যমেও তারা যুক্ত হবেন। অর্থাৎ পুরোনো ব্র্যান্ডকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনাটি শুধু দোকানের তাকে পণ্য তুলে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ডিজিটাল প্রচারণা, ডিস্ট্রিবিউটর নেটওয়ার্ক এবং খুচরা বিক্রেতাদের সম্পৃক্ত করে ভোক্তার কাছে নতুন রেড কাউ-এর গল্প পৌঁছে দিতে চাইছে প্রতিষ্ঠানটি।

পাউডার দুধ বলতেই রেড কাউ চিনতাম

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে কথা হয় নেক্সট অ্যাসোসিয়েশনের ম্যানেজার আবু নাঈমের সাথে। রেড কাউ নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণ যেন পুরো আয়োজনের নস্টালজিয়াটাকেই আরও সত্য-প্রাণবন্ত করে তুলেছে। বলতে বলতে তিনি যেন ফিরে গেলেন সেই সময়টায়। বললেন, একসময় চট্টগ্রামে রেড কাউ ছিল একটি ঐতিহ্যবাহী দুধ। পাউডার দুধ বলতেই অনেকেই রেড কাউকে চিনতেন। নব্বইয়ের দশকে পরিবারের বড়দের দুধ গুলে খাওয়ানো, রাতে টেলিভিশনে রেড কাউয়ের বিজ্ঞাপন দেখা; সবই তাঁর শৈশব-কৈশোরের অংশ হয়ে আছে।

পুরোনো সেই দিন আর এখনকার সময়ের ব্যবধানের একটা প্রার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এখন দুধ কেজি বা গ্রামের প্যাকেটে বিক্রি হলেও সে সময় রেড কাউ পাওয়া যেত এক, আড়াই কিংবা পাঁচ পাউন্ডের টিনের কৌটায়। এক পাউন্ডের কৌটাগুলো আমাদের খুব সুন্দর লাগতো। ব্যবহারের পর কৌটাগুলোতে আমরা কয়েন জমাতাম। রেড কাউ নিউজিল্যান্ডের হাত ধরে আবার বাজারে ফিরে আসায় তিনি ব্যাপক আনন্দিত। বিশেষ করে তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে পণ্যটি নতুন করে বাজারজাত করার উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন।

ছবি: অনুষ্ঠানে আগত অতিথি, ডিস্ট্রিবিউটর ও কোম্পানির কর্মকর্তাবৃন্দ

এবার স্মৃতি থেকে বাজারে

রেড কাউ-এর পুরোনো বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল গেয়েছিলেন ভারতের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী সুরেশ ওয়াডকর। সেই জিঙ্গেলের সুর এখন আর প্রতিদিন টেলিভিশনে শোনা যায় না। টিনের সেই কৌটাও অনেকের ঘরে নেই। কিন্তু একটি ব্র্যান্ডের সঙ্গে মানুষের তৈরি হয়ে যাওয়া আবেগের জায়গাটি সহজে মুছে যায় না। আর সেই আবেগকেই এবার নতুন বাজার কৌশলের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চাইছে রেড কাউ। কোম্পানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরো বাংলাদেশেই পণ্যটি সরবরাহ করা হবে। তবে প্রথম দিকে কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কারণ এসব এলাকায় তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে ভালো মানের দুধের চাহিদা রয়েছে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সবমিলিয়ে একদিকে নব্বইয়ের দশকের সেই পরিচিত টেলিভিশন-জিঙ্গেল, অন্যদিকে নতুন প্যাকেট, নতুন দাম ও ডিজিটাল ক্যাম্পেইন;দুই প্রজন্মের মাঝখানে একটি সেতুবন্ধন তৈরিতে কাজ করতে চান কোম্পানি সংশ্লিষ্টরা। এ যাত্রায় তারা সফল হবেন বলেও অনুষ্ঠানে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টস্ বাংলাদেশ লিমিটেডের হেড অব সেলস হামিদ খান ও চট্টগ্রামের এরিয়া সেলস ম্যানেজার জয়নাল আবদীন বাবলুর যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক নাজমুস সাকিব মল্লিক, পরিচালক ফারহান নাদিম মল্লিক, চিফ মার্কেটিং অফিসার আসিফুর রউফ, নেক্সট অ্যাসোসিয়েশনের স্বত্বাধিকারী এম তারিকুল ইসলাম, কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটর কামাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. জাহাঙ্গীর আলম এবং নেক্সট অ্যাসোসিয়েশনের ম্যানেজার আবু নাঈম।

অনুষ্ঠানে ডিস্ট্রিবিউটর ও সাধারণ ভোক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন,  উচ্চ প্রোটিন, প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এই দুধটি শিগগির ঐতিহ্য-আধুনিক ও সাশ্রয়ী মূল্যের সমন্বয়ে চট্টগ্রামের বাজারে ভালাভাবে সাড়া জাগাতে পারে।