বুধবার – ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৪ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বুধবার – ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৪ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সুতায় টান—‘স্মার্ট পরিকল্পনায়’ রফতানিখাতে নতুন দিগন্ত

দেশের রপ্তানিমুখীবাণিজ্যে এক কৌশলগত মোড়ের আভাস মিলছে। সম্প্রতি সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে ঘিরে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, তার আড়ালে উঠে এসেছে সরকারের একটি বৃহত্তর ও যুগোপযোগী বাণিজ্য কৌশল, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রাধান্যভিত্তিক বাণিজ্য পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে ধীরে ধীরে কাঁচামাল আমদানির উৎস পুনর্বিন্যাসের পথে হাঁটছে। এর অংশ হিসেবে ভারত থেকে সুতা আমদানিতে দীর্ঘদিনের বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও মানবসৃষ্ট ফাইবার (MMF) আমদানির দিকে ঝোঁকার কৌশল নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত মার্কিন বাজারে শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুযোগ পাবে, যা রপ্তানিখাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।

গত ৯ জানুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ডা. খালিলুর রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি অ্যাম্বাসেডর জেমিসন গ্রিয়ারের বৈঠকে এই প্রাধান্যভিত্তিক বাণিজ্য কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত প্রায় ২০ শতাংশ শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়। আলোচনায় উঠে আসা মূল প্রস্তাব হচ্ছে, বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও MMF জাতীয় কাঁচামাল আমদানি বাড়ায়, তাহলে তার বিপরীতে সম-পরিমাণ রপ্তানি ডিউটি-ফ্রি এক্সেস (শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার) পাবে।

সহজভাবে বললে, বাংলাদেশ যে পরিমাণ কাঁচামাল (তুলা ও MMF) যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করবে, তার সমতুল্য পরিমাণ তৈরি পোশাক মার্কিন বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যে এই ধরনের প্রাধান্যভিত্তিক সুবিধা ভিয়েতনাম, মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলো ইতোমধ্যে কাজে লাগাচ্ছে।

এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। আশির দশক থেকে দেশের তৈরি পোশাক খাতের সক্ষমতা বাড়াতে সরকার ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কম দামে সুতা আমদানিতে বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছিল। তবে বিদেশ থেকে কম দামে সুতা আমদানির ফলে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়ছে—এমন অভিযোগ তুলে দীর্ঘদিন ধরে বন্ড সুবিধা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।

চলতি মাসের ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেল-২ থেকে পাঠানো এক চিঠিতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে সুতার কাউন্ট স্পষ্টভাবে উল্লেখ ও কঠোর নজরদারির নির্দেশনা দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানানো হয়। এ পদক্ষেপ সম্পর্কে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ ও বিটিএমএর আহ্বানের ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—যার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে, দেশীয় শিল্প সুরক্ষা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান তৈরি।

সরকারি এই সিদ্ধান্তকে শুধু দেশীয় শিল্প সুরক্ষার বিষয় হিসেবে নয় বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হিসেবেও দেখছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চিত্র দীর্ঘদিন ধরেই অসম। ভারত থেকে বাংলাদেশ যেখানে প্রায় ৯০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে, সেখানে রপ্তানি মাত্র ১৫৭ কোটি ডলারের মতো। অর্থাৎ ভারত বাংলাদেশে বেশি বিক্রি করে, কিনে কম। সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার হলে ভারত থেকে আমদানি কমবে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস পাবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে প্রায় ১৯৫ কোটি ডলারের পণ্য, বিপরীতে রপ্তানি করেছে ৮১৩ কোটি ডলারের বেশি। অর্থাৎ এখানে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬১৭ কোটি ডলার। এই ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশ তাদের কাছ থেকে আরও কাঁচামাল আমদানি করুক, বিশেষ করে তুলা ও MMF।

ফলে ভারতের দিক থেকে সুতা আমদানিতে নিরুৎসাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝোঁকার এই নীতি একদিকে যেমন বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক, অন্যদিকে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের জন্য শুল্কমুক্ত রপ্তানির দরজা খুলে দিতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

তবে সরকারের এমন সিদ্ধান্তে বস্ত্রকল মালিকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও তীব্র অস্বস্তিতে পড়েছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকরা। সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে—এই আশঙ্কায় সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ ও বিকেএমই। সংগঠন দুটির নেতারা বলছেন, বেশি দামে সুতা কিনতে হলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিতে পারেন। তাদের মতে, স্পিনিং মিলগুলোকে সুরক্ষা দিতে হলে আমদানিতে শুল্ক আরোপ না করে নগদ সহায়তা, বিশেষ প্রণোদনা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

অন্যদিকে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ দাবি করেছেন, পোশাকশিল্প মালিকদের বক্তব্য পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কেবল ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা বন্ড সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে, নতুন কোনো শুল্ক আরোপ বা সেফগার্ড ডিউটির সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি আরও বলেন, বন্ড সুবিধার প্রকৃত উপকারভোগী দেশীয় পোশাক কারখানা নয়; বরং বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। বিপরীতে, দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো পার্শ্ববর্তী দেশের প্রতি কেজিতে প্রায় ৫০ সেন্ট ভর্তুকির কারণে অসম প্রতিযোগিতায় পড়ছে।

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই টানাপোড়েনের মাঝেই সরকারের‘ প্রাধান্যভিত্তিক বাণিজ্য কৌশল’ নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে যাচ্ছে। প্রাধান্যভিত্তিক বাণিজ্য পরিকল্পনা গ্রহণের মধ্য দিয়ে সরকার শুধু তাৎক্ষণিক কোনো সংকট মোকাবিলা করছে না বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্নির্ধারণে এক ধরনের কৌশলগত প্রজ্ঞার পরিচয় দিচ্ছে। একদিকে যেমন ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অসম বাণিজ্য ভারসাম্য সামাল দেওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছে, অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাজার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আরও গভীর ও ফলপ্রসূ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাঁচামাল আমদানিকে শুল্কমুক্ত রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত করার এই পরিকল্পনা প্রমাণ করে, সরকার কেবল প্রতিক্রিয়াশীল নয়; বরং আগাম ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। রপ্তানির প্রতিযোগিতা, কাঁচামালের নিরাপত্তা ও বাণিজ্য ভারসাম্য; এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে এক সুতোয় গেঁথে নেওয়ার মাধ্যমে সরকার দেখিয়েছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য কূটনীতিতে বাংলাদেশ এখন আর নিছক অংশগ্রহণকারী নয় বরং হিসাবি ও কৌশলগত খেলোয়াড়।

সবদিক মিলিয়ে বলা যায়, সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারকে বিচ্ছিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রাধান্যভিত্তিক বাণিজ্যের প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা উচিত। যথাযথ কূটনৈতিক দক্ষতা, তৎপরতা, নীতিগত সমন্বয় ও অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি নিশ্চিত করা গেলে, এই যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নিশ্চিত দীর্ঘমেয়াদি-ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।