বুধবার – ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৪ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বুধবার – ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৪ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

এলপিজি সংকট কাটছেই না

দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)–এর সরবরাহ সংকট ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে। সংকট নিরসনে জ্বালানি বিভাগ ও এলপিজি অপারেটরদের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। এর মধ্যে মূল্য সমন্বয় এবং ‘হয়রানি–জরিমানা’ বন্ধসহ একাধিক দাবি পূরণ না হওয়ায় আজ থেকে সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড।

সংগঠনটি জানিয়েছে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত দেশব্যাপী এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধ থাকবে। এ সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে সব কোম্পানির প্লান্ট থেকে এলপিজি উত্তোলনও বন্ধ রাখা হবে। গতকাল সন্ধ্যায় সারা দেশের পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের উদ্দেশে জারি করা এক নোটিসে এসব তথ্য জানানো হয়।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে দেশের এলপিজি বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়েও।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, দেশে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান এ সংকটের দ্রুতই কোনো সমাধান নেই। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্যটির ক্রয়াদেশ দেয়ার পর অন্তত ছয় সপ্তাহের মতো সময় প্রয়োজন হয় তা দেশের বাজারে আনতে। এর বাইরে জাহাজ সংকট, ভাড়া বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। চলমান সংকটের কারণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বরং দীর্ঘ সময় ধরে আমদানি বৃদ্ধির অনুমোদন না পাওয়া, বিশ্ববাজারে এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা, আমদানিতে অপারেটর সংকট এবং বাজারে বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমদানি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

দেশের বাজারে প্রতি বছর যে পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয় তার প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্য। প্রতি মাসে দেশের বাজারে গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ হয়। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, শ্রীলংকা, ভারতের ওড়িশার ধামরা সমুদ্রবন্দর দিয়ে অন্তত ৭০ হাজার টন গ্যাস আমদানি হয়। আর বাকি ৫০ হাজার টন বিশ্বের বিভিন্ন অপারেটর ও বন্দর হয়ে ইরান থেকে আসার কথা জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী।

বর্তমানে বিভিন্ন দেশের এলপি গ্যাস খাতের প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইরান থেকে আমদানি হওয়া গ্যাস বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে বিকল্প সরবরাহকারী এবং দেশের বাজারে ৫০ হাজার টন এলএনজির বিকল্প উৎস তৈরি না হলে সামনের দিনে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয় আমদানিকারকদের।

এক বছর আগেও দেশের অন্তত ২৭টি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করত। সেখানে বর্তমানে মূলত পাঁচটি অপারেটর এলপিজি আমদানি করছে বলে জানায় এলপি গ্যাস সমবায় ব্যবসায়ী সমিতি। দেশের বাজারে সাড়ে ৫ কোটি সিলিন্ডার থাকলেও বর্তমানে রিফিল হচ্ছে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখের মতো। সমিতির দেয়া হিসাব অনুযায়ী অন্তত ৪ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার অব্যবহৃত পড়ে আছে। এ খালি সিলিন্ডারের বড় অংশ সেসব অপারেটরের যারা আর এলপিজি আমদানি করছেন না। এসব কোম্পানির এলপিজি আমদানি বন্ধ করা এ খাতে সংকট তৈরির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) বলছে, দেশের বাজারে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা করে। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানির আমদানির অনুমোদন আছে। যদিও এখন মূলত পাঁচটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করছে। অন্যগুলোর আমদানি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। কোনো কোনো কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধের পথে। আবার অনেক কোম্পানি ব্যাংক ঋণের কিস্তি শোধেও হিমশিম খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরিতে বড় প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে সক্রিয় কিছু কোম্পানি আমদানি বাড়াতে চেয়ে বারবার আবেদন করেও দীর্ঘদিন সরকারের অনুমতি পায়নি।

গত নভেম্বরে দেশে এলপিজি আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫ হাজার টন। পরের মাস ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৭ হাজার টনে। আমদানি বাড়লেও বাজারে কেন সংকট তৈরি হয়েছে—তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষের দাবি, বিশ্ববাজারের মূল্যসূচক অনুযায়ী এলপিজির সম্ভাব্য দাম এক মাস আগেই জানতে পারেন সংশ্লিষ্টরা। এতে পরিবেশক ও ডিলারদের একটি অংশ আগেভাগেই বেশি দামে বিক্রির সুযোগ নেন।

অন্যদিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের পক্ষে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করার সুযোগ নেই। পরিবেশকদের কাছ থেকে যে দামে তারা সিলিন্ডার কিনছেন, তার চেয়ে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন তারা। তবে শীত মৌসুমে পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক বাসাবাড়িতে বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে হঠাৎ করেই চাহিদা ও বিক্রি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আকস্মিক এলপিজি সংকট তৈরির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা।

এদিকে ব্যবসায়ীদের আরেকটি অংশের মত, বাজারে যে সরবরাহ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, বাস্তবে তা পুরোপুরি সঠিক নয়।