বৃহস্পতিবার – ১৯শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ৫ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার – ১৯শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ৫ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জাকাত, কর রেয়াত ও ফ্যামিলি কার্ড: রাষ্ট্রীয় কল্যাণনীতির নতুন সম্ভাবনা

একজন বয়স্ক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল সেদিন। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বললেন, জাকাত ও আয়কর প্রদানের মাধ্যমে আমি ইহকাল ও পরকালের জন্য সারাজীবন ডাবল ট্যাক্স দিয়ে এসেছি। মানে একদিকে ধর্মের নির্দেশে জাকাত দিচ্ছি, অন্যদিকে রাষ্ট্রের জন্য আয়কর কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এ দুইয়ের মধ্যে একটা সমন্বয় থাকা উচিত।

বৃদ্ধের এ আক্ষেপটা অমূলক নয়। বলা যায়, এটি দেশের করনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও ধর্মীয় অর্থনৈতিক চর্চার মধ্যে এক গভীর অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি। আমাদের দেশে বহু মানুষ নিয়মিত জাকাত প্রদান করেন, আবার করযোগ্য আয়ের ওপর আয়করও দেন। কিন্তু জাকাত প্রদানের অর্থ, একটি স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা না থাকায় কিংবা কর ব্যবস্থায় সেটার স্বীকৃতি না থাকায়, জাকাতের বিরাট সামাজিক শক্তি বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে আমাদের দেশে জাকাতটা মৌসুমি উৎসবনির্ভর, বিচ্ছিন্ন ভাবে আদায় করা হয়, ফলে জাকাতের মূল উদ্দেশ্য দারিদ্র দূরীকরণ, সেটা আর হচ্ছে না আবার রাষ্ট্রও বঞ্চিত হয় একটি বহুল সম্ভাবনাময় সামাজিক তহবিল থেকে। প্রতিবার রমজান এলেই আমরা একটি চিরচেনা দৃশ্যের মুখোমুখি হই। সারিবদ্ধ লাইনে দাঁড়িয়ে, কারও হাতে লুঙ্গি, কারও হাতে শাড়ি আর কারও হাতে গামছা কিংবা একশো টাকার নোট। ছবি তোলা হয়, সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট হয়; এরপর চতুর্দিকে উঠে আত্মতৃপ্তির ঢেউ। কিন্তু দিন দুয়েক পরেই সেসব মানুষ ঠিক আগের জায়গায় ফিরে যায়, ক্ষুধা, ঋণ, ওষুধের অভাব, কর্মসংস্থানহীনতা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যত। তাই মনে একটা প্রশ্নের উদ্রেক ঘটে—এটাই কী জাকাতের শেষ কথা?

একদিকে ডাবল ট্যাক্সেশন অন্যদিকে নামমাত্র দায়মুক্তির জাকাত; আর বর্তমানে চাপে থাকা দেশের আর্থিক খাত; এমন যুগপৎ কঠিন বাস্তবতায় দেশের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকার ধাপে ধাপে চার কোটি পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার যে উচ্চমার্গীয় পরিকল্পনা নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। আপাতদৃষ্টিতে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, আয়বৈষম্য, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনসংকট; সব মিলিয়ে এমন একটি কর্মসূচি জনগণের কাছে নিঃসন্দেহে স্বস্তির বার্তা বহন করে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি কঠিন প্রশ্নেরও মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, এত বড় কর্মসূচির টেকসই অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে? অর্থাৎ ফ্যামিলি কার্ডের ‘ফান্ডিং সোর্স’ কী হবে?

দেশের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় বলাটা অত্যুক্তি হবে না যে—শুধুমাত্র রাজস্ব আহরণ, ঋণ বা বাজেট পুনর্বণ্টনের ওপর দাঁড়িয়ে কোটি কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিয়মিত সহায়তা দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে কঠিন, অসম্ভবও বটে। কিন্তু আশাজাগানিয়া ব্যাপার হচ্ছে, এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বহুবছর ধরে অবহেলিত সম্ভাবনায় আর্থিক খাতকে সামনে নিয়ে এসেছেন। আর তা হচ্ছে, জাকাত।

এ ব্যাপারে আমি শতভাগ একমত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে। সময় এসেছে জাকাতকে জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষা নীতির মূলধারায় নিয়ে আসার। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে জাকাত বোর্ড থাকলেও বেশিভাগ ক্ষেত্রে জাকাত এখনও মূলত ব্যক্তিনির্ভর ও অনিয়ন্ত্রিত। জাকাতের অর্থ যদি কেবল তাৎক্ষণিক খরচে শেষ হয়ে যায় তবে তার আধ্যাত্মিক ও সামাজিক তাৎপর্য অর্ধেকে থামিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু জাকাতকে যদি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এনে দরিদ্র পরিবারকে উৎপাদনশীল সম্পদ প্রদানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সাবলম্বী করা যায়, তাহলে সেটিই হবে ইসলামের সামাজিক-ন্যায়বিচারের দর্শনের সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রীয় কল্যাণনীতির প্রকৃত সংযোগ।

এমন কি করা যায় না, জাকাতকে ফ্যামিলি কার্ডের অর্থায়নের উৎস হিসেবে ব্যবহার করার জন্য জাকাতদাতাকে কর রেয়াত দেওয়া। অর্থাৎ যে ব্যক্তি সরকারি জাকাত ফান্ডে টাকা দেবেন ঠিক সেই পরিমাণ টাকার ওপর ঐ ব্যক্তি তাঁর আয়ের উপর আয়কর রেয়াত পাবেন। ফ্যামিলি কার্ডের জন্য একটি নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে জাকাতের টাকা জমা দিয়ে আয়কর নথীতে উল্লেখ করবেন কর রেয়াতের জন্য।

তবে আরেকটা বিষয় এখানে মূখ্য হয়ে উঠতে পারে। কোরআন-হাদিসে বলা আছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জাকাত নিকটস্থ অসহায় মানুষদের প্রদান করতে। ফলত একজন জাকাতদাতার মনে হতে পারে, তিনি রাষ্ট্রীয় ফান্ডে জাকাত দিলে তা দূরবর্তী মানুষের মাঝে বণ্টন হবে, আর তার নিকটস্থরা বঞ্চিত হবেন। তাই তিনি রাষ্ট্রীয় ফান্ডে জাকাত প্রদানে নিরুৎসাহিত বোধ করতে পারেন। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে—একজন জাকাতদাতা থেকে জাকাত সংগ্রহের পাশাপাশি রাষ্ট্র ওই ব্যক্তি থেকে তাঁর নিকটস্থ অসহায় গরিব-দুস্থ মানুষের তালিকা চেয়ে নিয়ে তাদের ফ্যামিলি কার্ডে অন্তর্ভুক্ত করা। ফলে জাকাতদাতা একটা মানসিক শান্তি পাবেন এই ভেবে যে তাঁর নিকটস্থ অসহায় মানুষদের মধ্যে যাদের ওপর তাঁর জাকাত প্রদান ফরজ তারাও ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন।

মূল কথা, জাকাতদাতার উদ্বেগ, প্রশ্ন, ধর্মীয় নির্দেশ ও সরকারি আদেশের প্রতি সম্মান রেখেই জাকাত ব্যবস্থাপনা নীতি সাজাতে হবে। যাতে করে একজন লোক জাকাত প্রদানের মাধ্যমে তাঁর চাওয়া মানসিক ও আধ্যাত্মিক তৃপ্তি দুটোই লাভ করতে পারেন আবার তাঁর অর্থ একটি বৃহৎ সামাজিক কর্মসূচিতে যাচ্ছে, ডাবল ট্যাক্সেশনের আক্ষেপ থেকেও আংশিক বা পুরোপুরিভাবে মুক্তি পাচ্ছেন, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

এই পুরো ব্যাপারটি আরও স্মার্টলি ডিল করতে চাইলে তখন সামনে আনা যায় আরেকটি সময়োপযোগী প্রস্তাব—Zakat Identification Number (ZIN)। যেমন একজন নাগরিকের TIN আছে, তেমনি একটি ZIN থাকতে পারে। এ ZIN-এর আওতায় জাকাতদাতা বছরের শুরুতে তাঁর সম্ভাব্য জাকাতের পরিমাণ ঘোষণা করবেন অথবা নির্দিষ্ট সময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত ফ্যামিলি কার্ডের জাকাত ফান্ডে অর্থ জমা দেবেন। সেই জমা ডিজিটালভাবে রেকর্ড হবে, নিরীক্ষিত হবে এবং অর্থবছরের শেষে তিনি প্রদত্ত জাকাতের পূর্ণ বা আংশিক অংশের বিপরীতে আয়করের ২০, ৩০ বা ৫০ শতাংশ অথবা নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় নির্ধারিত হারে কর রেয়াত পাবেন।

কেউ কেউ এ প্রস্তাবকে কল্পনাপ্রসূত ভাবতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশে এর আইনি ও প্রশাসনিক নজির ইতোমধ্যেই স্থাপিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশ থ্যালাসিমিয়া ফাউন্ডেশন তাদের জাকাত ফান্ডে দান বা অনুদানের বিপরীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) অনুমোদিত কর রেয়াত সুবিধা থাকার কথা জানিয়েছে। আয়কর আইন, ২০২৩ (২০২৩ সনের ১২ নং আইন)-এর অধীনে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত গেজেটে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য এমন কর রেয়াতের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র ইতোমধ্যেই স্বীকার করেছে, জনকল্যাণমূলক ও মানবিক উদ্দেশ্যে প্রদত্ত অর্থকে করনীতির মাধ্যমে উৎসাহিত করা যায়। যদি থ্যালাসিমিয়া রোগীদের চিকিৎসার মতো মানবিক খাতে এই নীতি প্রযোজ্য হয় তবে দরিদ্র পরিবারভিত্তিক একটি বৃহৎ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি যেমন ফ্যামিলি কার্ডের জন্য একটি স্বচ্ছ, নিরীক্ষাযোগ্য, রাষ্ট্রীয় জাকাত তহবিলে একই ধরনের কর রেয়াত কেন সম্ভব হবে না? বরং এখানেই রাষ্ট্রের হাতে বড় সুযোগ। এরুপ বিচ্ছিন্ন কিছু প্রতিষ্ঠানের কর-রেয়াত মডেলকে জাতীয়পর্যায়ে একটি কাঠামোবদ্ধ, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক জাকাত-সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় উন্নীত করা যায়।

যদি রাষ্ট্র একটি বিশ্বস্ত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলে, ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড দেয়, স্বীকৃতি ও কর-সুবিধা দেয়, এমনকি জাতীয় জাকাত সম্মাননা, সামাজিক অবদানস্বরুপ পুরস্কার বা বড় দাতাদের জন্য বিশেষ স্বীকৃতি চালু করে, তবে এটি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হতে পারে। যেমন: নিয়মিত কর প্রদানের ওপর ভিত্তি করে ব্যবসায়ীদের প্রতিবছর ‘সিআইপি’ সম্মাননায় ভূষিত করে সরকার। তদ্রুপ একজন সেরা জাকাতদাতাকে অনুরূপ জাতীয় সম্মাননায় ভূষিত করা যেতে পারে।

জাকাত কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়; এটি সামাজিক পুনর্বণ্টনের এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক হাতিয়ার। ফ্যামিলি কার্ড কেবল ভাতার কার্ড হলে তা সীমিত কিন্তু যদি এটি জাকাত, কর রেয়াত, ডিজিটাল শনাক্তকরণ, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা ও সাবলম্বীতা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে এটি হয়ে উঠতে পারে দেশের সামাজিক সুরক্ষা নীতির এক নতুন অধ্যায়।

ফ্যামিলি কার্ডকে একটি সরকারি কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখলে ভুল হবে, এবং আমাদের সবাইকে মিলে এটিকে সমষ্টিগতভাবে সফল করার পথ খুঁজতে হবে।