শুক্রবার – ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ২৩শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার – ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ২৩শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জেফরি এপস্টিন আসলে কে?

“আমি যৌন শিকারী নই, আমি একজন ‘যৌন অপরাধী’,” ২০১১ সালে নিউ ইয়র্ক পোস্টকে বলেছিলেন জেফরি এপস্টিন। “এটি একজন খুনি আর একজন বেগেল (এক ধরনের বেকারি পণ্য) চোরের মধ্যে পার্থক্য।”

জামিনের সুযোগ ছাড়াই যৌন অপরাধের অভিযোগে বিচারের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায়, ২০১৯ সালের ১০ই অগাস্ট নিউ ইয়র্কের একটি কারাগারে মারা যান এপস্টিন।

একজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে যৌনকর্মে বাধ্য করা সংক্রান্ত ঘটনায় যৌন অপরাধী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল জেফরি এপস্টিনকে।

তার বিরুদ্ধে যৌনতার জন্য অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের একটি “বিশাল নেটওয়ার্ক” চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।

গত বছরের নভেম্বরে, মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষই এপস্টিন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টকে অনুমোদন করে। এরপর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিল স্বাক্ষর করেন যাতে বিচার বিভাগকে ১৯শে ডিসেম্বরের মধ্যে এপস্টিনের বিরুদ্ধে সংঘটিত ফৌজদারি তদন্তের সমস্ত নথি প্রকাশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

গত ৩০শে জানুয়ারি, মার্কিন বিচার বিভাগ ৩০ লক্ষেরও বেশি নথি প্রকাশ করে। একটি ফুটেজে দেখা যায়, যখন এপস্টিনকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে যে তিনি নিজেকে শয়তান মনে করেন কি না, তিনি উত্তরে বলছেন, “আমার একটা ভালো আয়না আছে”।

প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা সম্পূর্ণ ভিডিও ফাইলটিতে তাকে একজন সাক্ষাৎকার গ্রহীতার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে দেখা গেছে। যদিও কে প্রশ্ন করছে, কখন এবং কেন এই ফুটেজটি ধারণ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করা হয়নি।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ বলেছেন যে “একটি অত্যন্ত বিস্তৃত নথি সনাক্তকরণ এবং পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার” এসব নথিপত্র প্রকাশ করা হয়েছে।

কিন্তু কিছু বিরোধী ডেমোক্র্যাটসহ অনেকেই বলছেন যে যথাযথ যুক্তি দেখানো ছাড়াই বহু নথিপত্র আটকে রেখেছে মার্কিন বিচার বিভাগ।

মার্কিন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এখন পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য প্রকাশিত তথ্য এপস্টিনের জীবন ও তার ক্ষমতাশালী চক্র সম্পর্কে অনেকটাই আলোকপাত করেছে।

হাই প্রোফাইল ব্যক্তিত্ব

নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণ করে সেখানে বেড়ে ওঠা জেফরি এপস্টিন ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শহরের বেসরকারি ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিদ্যা পড়াতেন। তবে নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা ও গণিত অধ্যয়ন করলেও কখনো স্নাতক হননি।

তার এক ছাত্রের বাবা তাকে পছন্দ করতেন এবং এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি এপস্টিনকে ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ ব্যাংক বিয়ার স্টার্নসের একজন সিনিয়র অংশীদারের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন।

চার বছরের মধ্যে সেখানে অংশীদার হয়েছিলেন এপস্টিন। ১৯৮২ সালের মধ্যে, তিনি তার নিজস্ব সংস্থা জে এপস্টিন অ্যান্ড কোং গড়ে তোলেন।

কোম্পানিটি তার গ্রাহকদের এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের সম্পদ পরিচালনা করে তাৎক্ষণিকভাবে সাফল্য অর্জন করে।

ফ্লোরিডার একটি প্রাসাদ, নিউ মেক্সিকোতে একটি খামার এবং নিউ ইয়র্কের বিশাল বড় ব্যক্তিগত বাড়ি, সেলিব্রিটি শিল্পী ও রাজনীতিবিদদের সাথে মেলামেশা, ইত্যাদির পেছনের এপস্টিন তার সম্পদ ব্যয় করতে শুরু করেন।

“আমি জেফকে ১৫ বছর ধরে চিনি। অসাধারণ মানুষ,” ২০০২ সালে এপস্টিন সম্পর্কে নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিনকে বলেছিলেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। “তার সাথে থাকতে অনেক মজা লাগে। বলা হয় যে সে আমার মতোই সুন্দরী মহিলাদেরকে পছন্দ করে, যাদের অনেকেই তরুণ বয়সী।”

“এতে কোনো সন্দেহ নেই – জেফরি তার সামাজিক জীবনটা উপভোগ করেন।”

পরে অবশ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন যে এপস্টিন প্রথমবার গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক বছর আগে, ২০০০ সালের গোড়ার দিকে তাদের দুজনের মধ্যে বিরোধ হয়েছিল। তিনি এপস্টিনের সাথে কোনো অন্যায়ে জড়িত থাকার কথা বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে যে ট্রাম্প একবার “কয়েক দশক আগে তার মহিলা কর্মীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করার জন্য” এপস্টিনকে তার ক্লাব থেকে বের করে দিয়েছিলেন।

ট্রাম্প নিজেই বলেছেন যে এপস্টিন তার মার-এ-লাগো বিচ ক্লাব স্পা-তে কাজ করা তরুণীদের “চুরি” করেছিলেন। “একবার যখন সে এটা করে, এটাই ছিল তার শেষ।”

ট্রাম্পের পাশাপাশি, এপস্টিন আরো বেশ কয়েকজন হাই-প্রোফাইল বন্ধু রেখেছিলেন বলে জানা যায়।

এপস্টিন ২০০২ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, অভিনেতা কেভিন স্পেসি ও ক্রিস টাকারকে একটি কাস্টমাইজড প্রাইভেট জেটে আফ্রিকায় নিয়ে যান। ২০০৩ সালে তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজক হার্ভে ওয়াইনস্টাইনের সাথে নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিন কেনার ব্যর্থ চেষ্টা করেন – একই বছর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেন এপস্টিন।

সম্প্রতি বিল ক্লিনটন এবং তার স্ত্রী, সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, হিলারি ক্লিনটন, এপস্টিনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের তদন্তে সাক্ষ্য দিতে সম্মত হয়েছেন।

জেফরি এপস্টিনের সাথে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিবিদ পিটার ম্যান্ডেলসনেরও বন্ধুত্ব ছিল – এই বন্ধুত্বের জন্য ম্যান্ডেলসন দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং এ কারণে ২০২৫ সালে তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে চাকরিটিও হারাতে হয়। ম্যান্ডেলসন পরে লেবার পার্টি থেকেও পদত্যাগ করেন।

ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে এপস্টিনকে সংবেদনশীল সরকারি তথ্য পাচারের অভিযোগ ওঠার পর, যুক্তরাজ্যের পুলিশ সরকারি অফিসে অসদাচরণের অভিযোগ পর্যালোচনা করছে।

এপস্টিন ফাইলের তথ্য অনুসারে, ম্যান্ডেলসন ইইউ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ইউরোর বেলআউটের আগাম নোটিশ দিয়েছিলেন এপস্টিনকে, যাতে তিনি ইউরো বাঁচাতে পারেন।

কিছু উচ্চপদস্থ বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও, এপস্টিন তার জীবনের অনেককিছুই ব্যক্তিগত রাখার চেষ্টা করেছিলেন। জানা যায়, তিনি সামাজিক অনুষ্ঠান এবং রেস্তোরাঁয় ডিনার এড়িয়ে চলতেন।

তিনি মিস সুইডেন বিজয়ী ইভা অ্যান্ডারসন ডুবিন এবং প্রকাশক রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের মেয়ে গিসলাইন ম্যাক্সওয়েলের মতো নারীদের সাথে প্রেমে জড়ালেও কখনো বিয়ে করেননি।

টিফানি অ্যান্ড কোং-এর সাবেক সিইও রোজা মঙ্কটন ২০০৩ সালের একটি নিবন্ধের জন্য ভ্যানিটি ফেয়ারকে বলেছিলেন যে এপস্টিন “খুব রহস্যময়” এবং “একটি ক্লাসিক আইসবার্গ” ছিলেন।

“আপনার মনে হবে যে আপনি তাকে চেনেন এবং তারপর আপনি পেঁয়াজের খোসার আরেকটি আবরণ খুলে দেখেন এর নীচেও অসাধারণ কিছু আছে,” মঙ্কটন বলেছিলেন। “আপনি যা দেখেন তা আপনি পান না।”

দোষী সাব্যস্তকরণ

২০০৫ সালে, ১৪ বছর বয়সী একটি মেয়ের বাবা-মা ফ্লোরিডার পুলিশকে জানান যে এপস্টিন তার পাম বিচের বাড়িতে তাদের মেয়েকে যৌন নির্যাতন করেছেন। পুলিশ তল্লাশি করে পুরো বাড়ি জুড়ে মেয়েদের ছবি খুঁজে পায়।

মায়ামি হেরাল্ড জানিয়েছে যে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের উপর তার নির্যাতন বহু বছর আগের ঘটনা।

পাম বিচের পুলিশ প্রধান মাইকেল রেইটার সংবাদপত্রকে বলেন, “এটি ‘উনি বলেছিলেন, তিনি বলেছিলেন’ জাতীয় পরিস্থিতি ছিল না।” তিনি যোগ করেন, “সবাই মূলত একই গল্প বলেছিল।”

“তিনি কখনো মেয়েদের বিষয়ে গোপনীয়তা রাখেননি,”এপস্টিনের মামলা যখন আদালতে উঠতে শুরু করে, সেই সময় কলামিস্ট মাইকেল উলফ ২০০৭ সালে নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিনকে বলেছিলেন।

“এক পর্যায়ে, যখন তার সমস্যা শুরু হয়েছিল, তখন তিনি আমার সাথে কথা বলছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘কী বলব, আমি অল্পবয়সী মেয়েদের পছন্দ করি।’ আমি বললাম, ‘হয়তো তোমার বলা উচিৎ, ‘আমি তরুণীদের পছন্দ করি’।'”

তবে, ২০০৮ সালে প্রসিকিউটররা তার সাথে একটি সমঝোতা চুক্তি করেছিলেন।

ফলে তিনি ফেডারেল অভিযোগ এড়িয়ে যেতে পারেন, যেসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার যাবজ্জীবন সাজা হতে পারতো।

তার বদলে তাকে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে এই সময়কালে তিনি সপ্তাহে ছয় দিন প্রতিদিন ১২ ঘন্টা তার অফিসে “কাজের জন্য মুক্তি” পেতে সক্ষম হন। এর ১৩ মাস পর তাকে নজরদারির শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়।

ওই চুক্তির বিষয়ে মায়ামি হেরাল্ড জানিয়েছে যে, এপস্টিনের অপরাধের ব্যাপকতা গোপন করে ফেডারেল প্রসিকিউটর আলেকজান্ডার অ্যাকোস্টা একটি প্লিহা চুক্তি (কম সাজার বিনিময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ স্বীকার করে নেবেন) করেন। এপস্টিনের অপরাধে আরো ভুক্তভোগী আছে কিনা অথবা আরো ক্ষমতাশালী ব্যক্তি এর অংশীদার কিনা, এফবিআইয়ের সেই তদন্তও অ্যাকোস্টা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

পত্রিকাটি এটিকে “শতাব্দীর চুক্তি” হিসাবে বর্ণনা করে।

এই কেলেঙ্কারির কারণে অ্যাকোস্টা ২০১৯ সালের জুলাই মাসে পদত্যাগ করেছিলেন। যদিও তিনি দাবি করেছিলেন যে, তার এই কাজের ফলে এপস্টিনের অন্তত কয়েকবছরের সাজা নিশ্চিত হয়েছিল।

২০০৮ সাল থেকে, নিউ ইয়র্কের যৌন অপরাধীদের নিবন্ধন তালিকায় এপস্টিনকে তৃতীয় স্তরের অপরাধী হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। এটা হচ্ছে এমন একটি তালিকা, যাদের সারাজীবনের জন্য যৌন অপরাধ করার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও এপস্টিন তার সম্পদ ধরে রেখে সেগুলোর ব্যবস্থাপনা চালিয়ে গেছেন।

২০১০ সালের ডিসেম্বরে, নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে এপস্টিনের সাথে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের তৃতীয় সন্তান অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসরের ছবি তোলা হয়েছিল, যা বিতর্কের জন্ম দেয়।

২০১৯ সালের নভেম্বরে বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে, অ্যান্ড্রু, যিনি ১৯৯৯ সাল থেকে এপস্টিনকে চেনেন, বলেছিলেন যে তিনি ২০১০ সালে তাদের বন্ধুত্ব ছিন্ন করার জন্য নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে এপস্টিনের বাড়িতে থাকার জন্য তিনি অনুতপ্ত।

পরবর্তীতে প্রকাশ হওয়া নথিপত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ইমেইল অনুসারে, অ্যান্ড্রু যতটা স্বীকার করেছিলেন, তিনি আসলে তার চেয়ে বেশি সময় ধরে এপস্টিনের সাথে যোগাযোগ রেখেছিলেন।

পরবর্তীতে, ২০২৫ সালে অ্যান্ড্রুর রাজকীয় উপাধি কেড়ে নেওয়া হয়।

এপস্টিনের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ভার্জিনিয়া রবার্টস – যিনি ভার্জিনিয়া গিফ্রে নামে পরিচিত ছিলেন – অভিযোগ করেছেন যে ২০০০ সালের গোড়ার দিকে যখন তার বয়স ১৭ বছর তখন তাকে অ্যান্ড্রুর সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয়েছিল।

অ্যান্ড্রু স্পষ্টভাবে তার সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন যে লন্ডনে তাদের একসাথে তোলা কোনও ছবির কথা তার মনে নেই।

কিন্তু ২০২২ সালে, তিনি মিজ গিফ্রেকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলা নিষ্পত্তির জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন।

এন্ড্রুর প্রাক্তন স্ত্রী সারা ফার্গুসনের সাথে এপস্টিনের বন্ধুত্ব সম্পর্কেও নতুন তথ্য উঠে এসেছে।

যখন ইমেইলের তথ্য প্রকাশ পায় যে ফার্গুসন কারাগারে থাকা এপস্টিনের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, তখন ফার্গুসনের দাতব্য সংস্থা, সারাহ’স ট্রাস্ট, “সাময়িক সময়ের জন্য” তাদের কার্যক্রম বন্ধ করার ঘোষণা দেয়।

প্যারিস থেকে নিজের ব্যক্তিগত জেট বিমানে করে ফেরার পর এপস্টিনকে ২০১৯ সালের ৬ই জুলাই নিউ ইয়র্কে গ্রেপ্তার করা হয়।

জানা গেছে, প্রসিকিউটররা তার নিউ ইয়র্কের প্রাসাদ বাজেয়াপ্ত করার আবেদন করেছিলেন, যেখানে তার কিছু অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এপস্টিন বরাবরই অন্যায় কাজ করার কথা অস্বীকার করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের জন্য নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

আদালত জামিন নাকচ করার পর, তাকে নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন সংশোধন কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল।

জুলাই মাসে তাকে ঘাড়ে আঘাতের জন্য কিছুক্ষণের জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল – এই তথ্য ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল – যা নিয়ে কারা কর্মকর্তারা বা তার আইনজীবীরা কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করেননি।

৩১শে জুলাই আদালতে তার শেষ হাজিরা দেওয়ার সময়, এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে তিনি এক বছর কারাগারে কাটাবেন, ২০২০ সালের গ্রীষ্মের আগে বিচার শুরু হবে না। প্রসিকিউটররা বলেছিলেন যে তারা বিলম্ব চান না এবং জনস্বার্থে দ্রুত বিচার শুরু করা হোক।

কিন্তু এপস্টিন কখনো বিচারের মুখোমুখি হননি।

ম্যাক্সওয়েলের বিচার

এপস্টিনের মৃত্যুর পর, তার প্রাক্তন বান্ধবী, গিসলাইন ম্যাক্সওয়েল, আলোচনায় আসেন।

২০২০ সালের জুলাই মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ার রাজ্যে তার নির্জন বাসভবন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, যেখানে তার বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়োগ ও ব্যবহার করে এপস্টিনের নির্যাতনে সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে, নিউ ইয়র্ক সিটির একটি জুরি বোর্ড তাকে ছয়টির মধ্যে পাঁচটিতে দোষী সাব্যস্ত করে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ছিল – একজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে যৌনতার উদ্দেশ্যে পাচার করা। তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যার ফলে ৬০ বছর বয়সী এই নারীকে তার বাকি জীবন কারাগারে কাটাতে হতে পারে।

অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা ম্যাক্সওয়েল এপস্টিনকে বিল ক্লিনটন ও অ্যান্ড্রু সহ অনেক ধনী আর ক্ষমতাশালী বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

তার বন্ধুরা জানিয়েছেন যে যদিও ম্যাক্সওয়েল ও এপস্টিনের প্রেমের সম্পর্ক মাত্র কয়েক বছর স্থায়ী হয়েছিল, তবুও তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ চালিয়ে গেছেন।

আদালতের নথিতে, পাম বিচের এপস্টিন ম্যানশনের প্রাক্তন কর্মচারীরা ম্যাক্সওয়েলকে বাড়ির ব্যবস্থাপক হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যিনি কর্মীদের তদারকি করতেন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা করতেন এবং সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করতেন।

ভ্যানিটি ফেয়ারে ২০০৩ সালে প্রকাশিত একটি প্রোফাইলে এপস্টিন বলেছিলেন যে ম্যাক্সওয়েল বেতনভুক্ত কর্মচারী ছিলেন না, বরং তার “সবচেয়ে ভালো বন্ধু” ছিলেন।

বিচার চলাকালীন, প্রসিকিউটররা অভিযোগ করেছেন যে ম্যাক্সওয়েল অল্পবয়সী মেয়েদের শিকারে পরিণত করে এপস্টিনের নির্যাতনের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। তার আইনজীবী দাবি করেন যে এপস্টিনের মৃত্যুর পর তার অপরাধের জন্য ম্যাক্সওয়েলকে বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল।

কিন্তু দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর, ম্যাক্সওয়েল কিছুটা অনুশোচনা প্রকাশ করে বলেছিলেন: “জেফরি এপস্টিনের সাথে দেখা হওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুশোচনা।”

তিনি ভুক্তভোগীদের উদ্দেশ্যে বলেন: “আপনারা যে যন্ত্রণা ভোগ করেছেন তার জন্য আমি দুঃখিত। আমি আশা করি আমার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সাথে সাথে আমার কঠোর কারাবাস আপনাদের সেই কষ্ট কিছুটা হলেও কমবে। “

ম্যাক্সওয়েলের আইনজীবীরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে যুক্তি দেন যে তার ভূমিকার জন্য তার বিচার করা বা তাকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিৎ হয়নি। তবে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সেটি প্রত্যাখ্যান করে। খবর: বিবিসি বাংলা