মঙ্গলবার – ২৭শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৩ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মঙ্গলবার – ২৭শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৩ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

টেক্সটাইল–গার্মেন্টস টানাপোড়েন: ০.৩% প্রণোদনায় কি মিটবে সুতা বিরোধ?

বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি ঘিরে দেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতে টানপোড়েন চলছে। টেক্সটাইল খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিদেশ থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় সুতা আমদানি দেশের টেক্সটাইল খাত অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। দেশের স্পিনিং মিলগুলো প্রতিযোগিতা হারিয়ে সক্ষমতা হারাবে। পোশাক খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এভাবে সুতা আমদানি করতে না পারলে পোশাকখাতে খরচ বেড়ে যাবে। সপ্তাহদুয়েক ধরে এই দুখাতে টানপোড়েনের নেপথ্যে রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, টেক্সটাইল খাত (বিটিএমএ) সংশ্লিষ্টদের আহ্বানের ভিত্তিতে সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ববোর্ড এনবিআরকে এর ফলে নড়েচড়ে বসে পোশাক খাত সংশ্লিষ্ট দুই সংগঠন বিজিএমইএ-বিকেএমই। এই সংকট সমাধান না হলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের সব টেক্সটাইল মিল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে বিটিএমএ।

সমাধান কোথায়?

অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানিকৃত সুতার ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের টেক্সটাইল খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে—বিশেষ করে সরবরাহের উৎস সংকুচিত বা এককেন্দ্রিক হয়ে পড়ার আশঙ্কায়। তবে একই সঙ্গে সতর্ক করা হচ্ছে, হুট করে সস্তা কাঁচামালের পথ বন্ধ করে দিলে ৪০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত মারাত্মক চাপের মুখে পড়তে পারে। এমন বাস্তবতায় সুতা আমদানি ঘিরে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতের টানাপোড়েন নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—সরকারের ০.৩ শতাংশ বিশেষ নগদ প্রণোদনা কি এই বিরোধ নিরসনে কার্যকর সমাধান হতে পারে, নাকি প্রয়োজন আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও সময়বদ্ধ নীতিগত উদ্যোগ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারের উচিত ঢালাওভাবে আমদানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কার্যকর সমাধান খোঁজা। এসব সমাধানের মধ্যে থাকতে পারে সীমিত আকারে নগদ ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা, এলডিসি বিধিমালার আওতায় বিশেষ ঋণের সুবিধা, অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত, অথবা একটি কোটা ব্যবস্থা যেখানে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ থাকবে।

সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ‘উপায় আছে। এটি মিশ্র পদ্ধতি হতে পারে—কিছু জায়গায় বিধিনিষেধ আরোপ করা এবং অন্য জায়গায় নিয়ম শিথিল করা, যাতে সব খাতই তাদের প্রাপ্য গুরুত্ব ও সুবিধা পায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এদের কেবল দুটি আলাদা শিল্প হিসেবে দেখা উচিত নয় বরং তারা অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ। শুল্ক-সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর ভারসাম্য রক্ষায় সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে।’

সমাধানের জন্য  সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে বসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এনবিআর নির্দিষ্ট কিছু শিল্প থেকে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রভাব পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। একইসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কেও দেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে শুল্ক কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

ভারত থেকে বাংলাদেশি সুতার দাম বেশি কেন?

ভারতের স্পিনিং মিল মালিকরা রপ্তানিতে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা ও প্রণোদনা পাচ্ছেন, যার ফলে তারা স্থানীয় বাজারের তুলনায় বাংলাদেশে একই মানের সুতা প্রায় ০.৩০ ডলার কম দামে বিক্রি করতে পারছেন। এই মূল্যছাড়কে এখানকার টেক্সটাইল মিলাররা ‘ডাম্পিং’ হিসেবে দেখছেন। খাত সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, রপ্তানি রিবেট, প্রযুক্তি উন্নয়ন তহবিল, উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা এবং বিদ্যুৎ, জমি ও অর্থায়নে রাজ্য পর্যায়ের ভর্তুকি মিলিয়ে ভারতীয় সুতা রপ্তানিকারকরা কেজিপ্রতি আনুমানিক ০.৩০ ডলার সমপরিমাণ সুবিধা পাচ্ছেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে স্পিনিং খাতের সহায়তা কমানো হয়েছে। একসময় স্থানীয় সুতায় তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত থাকলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ১.৫ শতাংশে। তিন বছর আগে গ্যাসের দাম এক ধাপে ১৭৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে প্রায় ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে এবং রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে কম সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। এছাড়া কর অবকাশ ও অন্যান্য প্রণোদনাও বাতিল করা হয়েছে।

শিল্পের কিছু স্পিনিং মিল অতি উচ্চ প্রযুক্তির এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত যন্ত্রপাতি আমদানি করেছে, যার ফলে ব্যয় বেড়ে গেছে এবং ব্যাংকের দায়ও ভারী হয়েছে। এসব কারণে ভারত ও বাংলাদেশের স্পিনিং শিল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার ব্যবধান ক্রমেই প্রশস্ত হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানিকৃত সুতার ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করে—বিশেষ করে সরবরাহের উৎস সংকুচিত বা এককেন্দ্রিক হলে। তবে সতর্ক করা হচ্ছে, হঠাৎ করে সস্তা কাঁচামালের প্রাপ্তি বন্ধ করলে ৪০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত মারাত্মক চাপের মুখে পড়তে পারে।

বিটিএমএ দাবি করছে, শুল্কমুক্ত আমদানিকে অব্যাহত রাখলে স্থানীয় মিলগুলোর অস্তিত্বের জন্য তা বড় হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে পোশাক প্রস্তুতকারকদের সংগঠন—বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ—পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেছে, যে বন্ড সুবিধা বাতিল করলে উৎপাদন ব্যয় ৮–১০ শতাংশ বেড়ে যাবে। এতে রপ্তানিকারকদের বছরে দুই বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অতিরিক্ত খরচ হবে।

যদি শুল্কমুক্ত সুবিধা না দেওয়া হয়, রপ্তানিকারকরা সুতা আমদানি করতে গিয়ে প্রায় ৩৭ শতাংশ বাড়তি শুল্ক গুনতে বাধ্য হবেন, যা আমদানি পথে লাভজনক নয়। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে স্থানীয় মিল থেকে সুতা কেনা ছাড়া উপায় থাকবে না, যেখানে প্রতি কেজিতে ০.৪০–০.৬০ ডলার অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হবে।

বর্তমানে প্রতি কেজি সুতা ভারত থেকে আমদানি করতে খরচ পড়ছে গড়ে ২.৫৫ ডলার, যেখানে একই সুতা স্থানীয় মিল মালিকরা ২.৮০ ডলারের নিচে বিক্রি করতে পারছেন না। স্থানীয় মিল মালিকরা বলছেন, এই দরে বিক্রি করলেও তাদের লোকসান হচ্ছে। তবে রপ্তানিকারকেরা যুক্তি দেন, বিদেশি ক্রেতারা বাড়তি দাম দিতে নারাজ। মিলাররা মনে করছেন, এই তুলনাটি অন্যায় এবং স্থানীয় উৎপাদনকে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার বাইরে ঠেলে দিচ্ছে।

টানাপোড়েনের পেছনের গল্প

একসময় সুতা ও ফ্যাব্রিক আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশ। তবে গত তিন দশকে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’, যার ফলে স্থানীয় উৎপাদনকারীরাই এখন নিটওয়্যারের প্রায় পুরো চাহিদা এবং ওভেন পোশাকের প্রায় অর্ধেক চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

কিন্তু গত দুই-তিন বছরে সেই অর্জন চাপের মুখে পড়েছে। ভারতের সুতা সস্তা হওয়ায় পোশাক রপ্তানিকারকরা ক্রমশ আমদানি নির্ভর হয়ে উঠেছেন। সরকারি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের পরবর্তী দুই বছরে সুতা আমদানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যেখানে ভারতের অবদান শীর্ষে।

ফলে স্থানীয় মিলগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব তীব্র। পোশাক অর্ডার কমে যাওয়ায় স্পিনিং মিলগুলোতে স্বাভাবিকের তিন-চারগুণ বেশি মজুত জমেছে, উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় অর্ধেক অলস পড়ে আছে। এই মন্দা উইভিং, ডাইং ও প্রিন্টিং খাতেও ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে প্রায় ২ হাজার টেক্সটাইল ইউনিটের কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।

মিল মালিকদের কয়েক মাসের অনুরোধের পর সরকার বন্ড লাইসেন্সের আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আনার উদ্যোগ নেন। প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসতেই রপ্তানিকারকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। এরপর বিটিএমএ মিল বন্ধের হুঁশিয়ারি দিলে দুই খাতের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে চলে আসে।