শুক্রবার – ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার – ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

তাৎক্ষণিক ভর্তি, আধুনিক শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ—প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন বাস্তবতা

উচ্চ মাধ্যমিক শেষে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের প্রধান অনিশ্চয়তা শুরু হয় উচ্চশিক্ষায় ভর্তিকে কেন্দ্র করে। প্রতি বছর যে পরিমান শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় তার তুলনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা অপ্রতুল। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট ১২,৫১,১১১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭,২৬,৯৬০ জন পাশ করলেও, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৩৬টি পাবলিক মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে আসন বরাদ্ধ রয়েছে মাত্র ৬৪,৩৫০টি (ইউজিসি, ২০২৫)। ফলে প্রায় ৬৬২,৬১০ জন পাশ করা শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না।

এছাড়াও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি জন্য অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়, দিতে হয় একাধিক ভর্তি পরীক্ষা আর এই অপেক্ষার সময়েই তৈরি হয় একটি অদৃশ্য ক্ষয়, সময়, অর্থ ও মানসিক শক্তির ক্ষয়। একজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষার পর থেকেই ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কোচিং শুরু করে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষার সময় সাধারণত ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। অর্থাৎ প্রায় ৬ থেকে ৮ মাস কোনো একাডেমিক অধ্যয়ন ছাড়া কেটে যায় শুধু প্রস্তুতির পেছনে। অনেকে প্রথম বছরে সুযোগ না পেয়ে আবার পরের বছর চেষ্টা করে, ফলে প্রায় দেড় থেকে দুই বছরের একাডেমিক পড়াশোনার সময় হারিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যয়ও কম নয়। ভর্তি কোচিং, ভর্তি ফর্ম ফি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতের অতিরিক্ত খরচ, থাকার ব্যবস্থা, সব মিলিয়ে একজন শিক্ষার্থীর পরিবারের খরচ প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৮০,০০০ টাকা পর্যন্ত হয় (সূত্র: বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো – (ব্যানবেইস ২০২৩) । তবুও সাফল্যের নিশ্চয়তা নেই। অনেকে সব চেষ্টার পরও কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পেরে শেষমেশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারস্থ হন। এছাড়া, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থী তার ইচ্ছামতো বিষয় পড়ার সুযোগ পায়, কারণ আসন সীমিত এবং বিষয় অনুযায়ী ভর্তি সীমাবদ্ধতা। এই সমস্যা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকটা সমাধান করেছে। এখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও সুযোগের মধ্যে থেকে নিজেদের পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হতে পারে।

হাসান (২০২০) এবং করিম ও ইসলাম (২০২২)-এর গবেষণায় দেখা যায়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ পায়। এর মূল কারণ হলো সেশনজটের অনুপস্থিতি, নিরবচ্ছিন্ন  সেমিস্টারভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ভর্তির নমনীয়তা। অন্যদিকে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি বিলম্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ডিগ্রি সম্পন্ন হতে বেশি সময় লাগে। ফলে তারা তুলনামূলকভাবে দেরিতে চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। বর্তমানে বাংলাদেশে ইউজিসি অনুমোদিত ১১৬টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে (সূত্র: ইউনিভার্সিটিজ গ্রান্ট কমিশন, ২০২৪)। এগুলোর অনেকেই আন্তর্জাতিক কারিকুলাম, আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি, ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা ও শিল্পখাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে শিক্ষাকে আরও কর্মমুখী ও বাস্তবভিত্তিক করে তুলেছে। ইউজিসি ও বিশ্বব্যাংক (২০২২)-এর যৌথ গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্রুত ও তাৎক্ষণিক ভর্তি, ধারাবাহিক সেমিস্টারভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও সেশনজটমুক্ত পরিবেশ শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। ফলে তারা গড়ে চার বছরেই ডিগ্রি সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে, যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের কারণে ৫ বছর বা তারও বেশি সময় লাগে। সময়ের এই পার্থক্যই কর্মজীবনে প্রবেশের বয়সে প্রভাব ফেলে। যদি একজন শিক্ষার্থী এক বছর আগে কর্মজীবন শুরু করতে পারে, তবে তার গড়ে ৪–৫ লাখ টাকার আয় বৃদ্ধি ঘটতে পার, যা একটি পরিবারের জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুফল।

এছাড়া, অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এখন মেধা ও আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে স্কলারশিপ, টিউশন ফি মওকুফ, ও ফ্লেক্সিবল পেমেন্ট প্ল্যান চালু করেছে। ফলে টিউশন ফি-র ভারও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপদ ক্যাম্পাস, আধুনিক ল্যাব সুবিধা, এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, যা শিক্ষার মান উন্নত করতে সহায়ক। তবে এই চিত্র একপাক্ষিক নয়। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও গবেষণা, একাডেমিক মর্যাদা এবং ইতিহাসে এগিয়ে। কিন্তু সব শিক্ষার্থীর জন্য সেই সুযোগ পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটি বিকল্প ও বাস্তবসম্মত সুযোগ তৈরি করেছে। ইউজিসি ও বিশ্বব্যাংক-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫% উচ্চশিক্ষার্থী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে (ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২৩)। এটি প্রমাণ করে যে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার আর “বিকল্প নয় বরং মূল ধারার অংশ হয়ে উঠেছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, মানবসম্পদ উন্নয়নে সময় ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শিক্ষার্থী যদি নির্ধারিত সময়ে একাডেমিক যাত্রা শুরু করতে পারে, তবে তার কর্মজীবন, আয় ও জীবনমান, সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিপরীতে, দীর্ঘ প্রস্তুতি ও অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীর একাডেমিক অগ্রগতি ও মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উচিত সময়ের মূল্য অনুধাবন করে বাস্তবধর্মী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার অদৃষ্টের অপেক্ষায় সময় নষ্ট না করে, মানসম্মত, আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থায়, যেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ডিজাইন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ রয়েছে, সে ধরনের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই হতে পারে সঠিক পথ।

সর্বোপরি, আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি এমন উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে “সময়” কোনো প্রতিবন্ধকতা নয় বরং উন্নতির সোপান। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাৎক্ষণিক ভর্তি ও কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে সেই সোপান তৈরি করছে, এখানে সুযোগের দরজা খোলা, সময়ের অপচয় কম, আর শিক্ষার্থীদের দ্রুত একাডেমিক ও পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ রয়েছে। এটি ব্যক্তিগত বিকাশের পাশাপাশি জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শান্ত-মারিয়ম ইউনিভার্সিটি অফ ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি।

তথ্যসূত্র: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ, “জাতীয় শিক্ষাতথ্য প্রতিবেদন ২০২৪” বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS), “Higher Education Statistics 2023” ইউনিভার্সিটিজ গ্রান্ট কমিশন (UGC), “Annual Report 2023–2025” University Grants Commission (UGC), Press Release, 2025: “Public University Seats vs GPA-5 Achievers” World Bank & UGC Joint Study, Higher Education Quality and Access in Bangladesh, 2022