বৃহস্পতিবার – ৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ২২শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার – ৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ২২শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পোশাকশিল্প: চট্টগ্রামের সেই ৪০ শতাংশ রপ্তানি কোথায় হারালো?

এক সময় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু ছিল চট্টগ্রাম। দেশের মোট রপ্তানিমুখী পোশাক উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশই হতো এই বন্দরনগরীতে। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই অবস্থান নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। বর্তমানে জাতীয় পোশাক রপ্তানিতে চট্টগ্রামের অবদান নেমে এসেছে মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশে।

এই শিল্পের সূচনালগ্নের গল্পটিও জড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের সঙ্গে। ১৯৭৭ সালে নগরের কালুরঘাট শিল্প এলাকায় প্রায় ৯ একর জমির ওপর অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা নুরুল কাদের প্রতিষ্ঠা করেন দেশের প্রথম রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা—দেশ গার্মেন্টস। সেই কারখানার হাত ধরেই যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প, যা পরবর্তী কয়েক দশকে বিকশিত হয়ে আজ দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিনির্ভর খাতে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মোট রপ্তানি আয় প্রায় ৪,৮০০ কোটি ডলার। দেশজুড়ে শিল্পটির বিস্তার ঘটলেও সেই অগ্রগতির ধারায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়েছে এক সময়ের পথপ্রদর্শক চট্টগ্রাম।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)–এর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে নিবন্ধিত পোশাক কারখানার সংখ্যা ৬২০টি। তবে এর মধ্যে বর্তমানে চালু রয়েছে ৩৪৩টি কারখানা। বাকি ২৭৭টি কারখানা বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে আছে। চালু কারখানাগুলোতে প্রায় ৫ লাখ শ্রমিক কর্মরত।

অন্যদিকে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)–এর হিসাবে, চট্টগ্রামে নিটওয়্যার খাতে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১১০টি। এর মধ্যে ৯১টি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত রপ্তানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ—উভয় সংগঠনের সঙ্গেই নিবন্ধিত।

বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট পোশাক রপ্তানির ১০ থেকে ১২ শতাংশ। অথচ এক সময় দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা ছিল এই নগরীতেই।

খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাব চট্টগ্রামের পোশাক শিল্পকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিয়েছে। এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে শিল্পের ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে চট্টগ্রামের অবস্থান আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম থেকে যাত্রা ও বিস্তার

মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে নুরুল কাদের সরকারি চাকরি ছাড়েন। ব্যবসায় মনোযোগ দিয়ে তিনি পরে দক্ষিণ কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে দেশ গার্মেন্টস গড়ে তোলেন। কারখানা চালুর আগে ১৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দক্ষিণ কোরিয়ায় নিয়ে গিয়ে ছয় মাসের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তারাই দেশের তৈরি পোশাক খাতের বিস্তৃতি ঘটান। কেউ কেউ পরে কারখানা মালিকও হয়েছিলেন। এভাবে শুরু হয়েছিল দেশের প্রধান রপ্তানি খাত।

খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, শুরুর দিকে চট্টগ্রামে এ খাতের বিস্তার ঘটে মূলত মার্কিন কোটার সুযোগ কাজে লাগিয়ে। আশির দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে পোশাকের ক্রয়াদেশ দেওয়া হতো কোটার মাধ্যমে। ১৯৭৪ সালে কার্যকর হওয়া মাল্টিফাইবার চুক্তির (১৯৭৪–৯৪) আওতায় এই কোটা পেত বাংলাদেশও। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই চট্টগ্রামে গড়ে ওঠে অসংখ্য কারখানা। আর রপ্তানি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড) প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৯৪ সালে মাল্টিফাইবার চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও, ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘দ্য অ্যাগ্রিমেন্ট অব টেক্সটাইল ও ক্লথিংয়ের (এটিসি)’ আওতায় নতুন করে আবারও কোটাসুবিধা চালু হয়—যা ২০০৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল ছিল।

এই সময়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে মূলত মার্কিন বাজারনির্ভর একটি রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের বলয় তৈরি হয়। এশিয়ান, প্যাসিফিক, কেডিএস, ক্লিফটন এবং ইয়াংওয়ানের মতো শিল্প গ্রুপের হাত ধরে এই খাত আরও সমৃদ্ধ হয়। উদাহরণস্বরূপ, ইয়াংওয়ান ১০০ কোটি ডলারের রপ্তানির মাইলফলক অতিক্রম করে, আর প্যাসিফিক জিন্স আজও বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানিতে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছে।

জাপানের বহুজাতিক খুচরা বিক্রেতা ইউনিক্লো তাদের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। এছাড়া সিঅ্যান্ডএ, টেসকো, মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার এবং টম টেইলরের মতো ব্র্যান্ডের জন্যও তারা পোশাক তৈরি করে। প্যাসিফিক জিন্স এখন বিশ্বের ৫২টি দেশে পণ্য রপ্তানি করে।

অবকাঠামো সংকটে স্থবির অগ্রগতি

বিজিএমইএর তথ্য বলছে, ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪০টি নতুন কারখানা স্থাপিত হয়। কিন্তু ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা কমে বছরে প্রায় ১৭টিতে দাঁড়ায়। আর ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি বছর ১০টিরও কম নতুন কারখানা স্থাপিত হয়েছে। এই সময়ে অনেক কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। পরিসংখ্যানে স্পষ্ট, কয়েক দশকে নতুন কারখানা স্থাপনের হার অর্ধেকে নেমে এসেছে।

ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্প বিস্তারের পেছনে অবকাঠামো ও নীতিগত সুবিধাই বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আবদুস সালামের মতে, এই বৈষম্য তৈরি হয় মূলত ২০০৫ সালের পর থেকে।

তিনি বলেন, ‘২০০৫ সাল থেকে তৈরি পোশাক খাতের সম্প্রসারণ শুরু হয়েছিল। আর তখন থেকেই চট্টগ্রামে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা হয়। কিন্তু বিপরীতে ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছিল।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঢাকার পার্শ্ববর্তী শিল্প এলাকাগুলোতে টেক্সটাইল, স্পিনিংসহ তৈরি পোশাক খাতের নতুন নতুন কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করে।

একই সময়ে ঢাকাভিত্তিক কারখানা মালিকেরা কমলাপুর রেলওয়ে আইসিডির বন্দরের সুবিধা পেতে থাকেন, যা রপ্তানি কার্যক্রমকে আরও সহজ করে তোলে। তিনি বলেন, ‘ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে আইসিডির বন্দরের সুবিধা পেতে শুরু করলেন ঢাকার কারখানা মালিকেরা। তখন সেখানে দ্রুত সম্প্রসারণ হয়।’

চট্টগ্রামের তুলনায় ঢাকার আশপাশের শিল্প এলাকায় জমির দাম কম থাকাও বড় একটি কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, ‘জমির পেছনে যদি ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়, তাহলে তো আর যন্ত্রপাতি কেনার টাকা থাকে না। এটিও একটি বড় কারণ ছিল।’

এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতাদের জন্য যোগাযোগ সুবিধাও ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্প বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে জানান তিনি। তার মতে, ইউরোপের ক্রেতারা ঢাকায় এসে সহজেই কাজ শেষ করে দেশে ফিরে যেতে পারতেন, কারণ সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে উন্নত ছিল।

সম্প্রসারণের যুগে চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থার কারণে তৈরি পোশাক খাত পিছিয়ে পড়তে হয়েছে বলে মনে করেন ক্লিফটন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমডিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ভাঙাচোরা ছিল। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো ছিল না। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ছিল না। ব্যাংকিং সুবিধাসহ সরকারি সুযোগ-সুবিধা ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে যায়। এসব কারণে চট্টগ্রাম পিছিয়ে পড়েছে। একসময় তৈরি পোশাক রপ্তানির ৪০ শতাংশ চট্টগ্রাম উৎপাদন হতো। বর্তমানে তা ১০ শতাংশের আশপাশে নেমে এসেছে।’

সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়

দীর্ঘ সময় ধরে ধীরগতিতে চললেও চট্টগ্রামের তৈরি পোশাক শিল্পে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ এখনো রয়েছে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, সঠিক নীতিগত সহায়তা ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বন্দরনগরীটিতে আবারও এই খাতের সম্প্রসারণ সম্ভব।

ক্লিফটন গ্রুপের মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতে, জ্বালানি সরবরাহই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। তিনি বলেন, এলএনজির মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখা গেলে শিল্পকারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সেখানে একটি গার্মেন্টস ভিলেজ গড়ে তোলা হলে চট্টগ্রামে নতুন করে তৈরি পোশাক শিল্পের বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এশিয়ান গ্রুপের এমডি মোহাম্মদ আবদুস সালামের ভাষ্যে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও ইউরোপের দেশগুলো রপ্তানি বাড়াতে আমরা কাজ করছি। এক্ষেত্রে সরকারকে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের বিষয়টি সমাধান করা গেছে। সামনে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে ভাবতে হবে। এখনও বাংলাদেশ প্রস্তুত নয়। সরকারের নীতিগত সহায়তা পেলে তৈরি পোশাক খাত সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।’