একপাশে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে অন্যপাশে সমুদ্রের ঢেউয়ের শীতল বাতাস আর শিল্পাঞ্চলের ব্যস্ততা। চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান এই প্রবেশপথে গত শনিবার দেখা মিলল এক ব্যতিক্রম দৃশ্যের। যেখানে মূল সড়কের ধার ঘেঁষে মাটি খুঁড়ে বীজ বুনছেন একদল তরুণী। যাদের সঙ্গী হয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাও।
চট্টগ্রাম নগরীকে আরও সবুজ-সুন্দর করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পতেঙ্গার বিমানবন্দর এলাকায় যৌথভাবে এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন (এইউডব্লিউ)-এর প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থী।
এইউডব্লিউ-এর গ্রিন ব্যাঙ্গেল প্রজেক্ট’বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভিস লার্নিং সেন্টার (এসএলসি) এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হয় এই কর্মসূচি। এদিন পতেঙ্গার ওই এলাকায় খেজুর ও তালগাছের চারার পাশাপাশি মাটিতে বোনা হয় ৫০০টি তালের বীজ।

এ ব্যতিক্রমী আয়োজনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থেকে কাজের সমন্বয় করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক এবং প্রধান তালগাছ গবেষক ড. মোসে সেলভাকুমার পলরাজ ও এসএলসি’র সমন্বয়ক মিফতাহুল জান্নাত। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন উপ-সচিব প্রণয় চাকমা এবং স্থপতি তাসনুভা চৌধুরীসহ অন্যান্য প্রতিনিধিরা।
পতেঙ্গা এলাকাটি কেবল বিমানবন্দরের জন্যই নয়, ভারী শিল্পকারখানার কারণেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আবার দেশের বাইরে থেকে আসা মানুষদের কাছে এটিই চট্টগ্রামের প্রথম দরজা। তাই আয়োজকেরা মনে করছেন, বিমানবন্দরের এই সড়কটির দুই পাশে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো এবং আগের গাছগুলো রক্ষা করা গেলে শহরের প্রবেশপথের চেহারাটাই বদলে যাবে। ‘সবুজ চট্টগ্রাম’ গড়ার যে বড় স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, তার মূল কথাই হলো নগরের উন্নয়ন আর পরিবেশ রক্ষা যেন হাত ধরাধরি করে চলে। সবুজে ঘেরা বিমানবন্দর সড়ক কেবল শহরের সৌন্দর্যই বাড়াবে না, পথচারীদের মাথার ওপর ছায়া দেবে এবং চারপাশের আবহাওয়াকেও রাখবে স্বস্তিদায়ক।
চারা রোপণের ফাঁকে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেন সিটি করপোরেশনের উপ-সচিব প্রণয় চাকমা। শহরকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর রাখতে সিটি করপোরেশনের নানা প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নগরের সৌন্দর্য বাড়াতে গাছ লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। এই কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসাকে তিনি স্বাগত জানান। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও শিল্পায়নের প্রভাবে আবহাওয়া যেভাবে বদলে যাচ্ছে, তা নিয়েও এসময় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
বাংলার চিরচেনা ষড়ঋতুর কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বাড়তে থাকা তাপমাত্রা ও অসময়ের আবহাওয়া থেকে বাঁচতে প্রকৃতিকে রক্ষা করতেই হবে। ভবিষ্যতেও এমন যৌথ উদ্যোগে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবল বর্তমান বাসিন্দাদের জন্য নয়, একটি সবুজ ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও।
তবে শহর সুন্দর করা মানে তো শুধু মাটিতে চারা পুঁতে চলে আসা নয়। আয়োজকদের কথায়ও উঠে এল সেই বাস্তবতাও। তাঁরা জানান, নতুন গাছ লাগানোর পাশাপাশি শহরের টিকে থাকা গাছপালা বাঁচানো, সড়কের পাশের সবুজের যত্ন নেওয়া এবং খোলা জায়গাগুলো টিকিয়ে রাখাও সমান জরুরি। নগর পরিকল্পনার ভেতরেই পরিবেশের বিষয়টি থাকতে হবে। বাংলাদেশের সামগ্রিক বনাঞ্চল আর শহরের গাছপালার হিসাব হয়তো এক নয় কিন্তু পরিবেশের স্থায়ী সুরক্ষার জন্য প্রাকৃতিক বন বাঁচানোর পাশাপাশি শহরের বুকে সবুজের পরিধি বাড়ানোও এখন সময়ের দাবি।
বাংলার অতি চেনা তাল ও খেজুর গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে এইউডব্লিউ-এর ২০ জন শিক্ষার্থী দেখিয়ে দিলেন, কীভাবে সরাসরি মাঠপর্যায়ে নেমে সমাজের জন্য কাজ করা যায়। ‘গ্রিন ব্যাঙ্গেল প্রজেক্ট’-এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি চায় তাদের শিক্ষার্থীরা যেন ক্যাম্পাসের চার দেয়ালের বাইরে এসেও পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার এই সুযোগ শিক্ষার্থীদের জন্যও ছিল দারুণ এক অভিজ্ঞতা।
তবে বীজ বুনলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ৫০০ তালের বীজ থেকে ঠিকঠাক চারা গজানো এবং সেগুলো বড় হয়ে ওঠা নির্ভর করবে অনুকূল পরিবেশ, সুরক্ষা ও নিয়মিত দেখভালের ওপর। চারাগুলো যাতে টিকে থাকে এবং সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করতে পারলেই মিলবে দীর্ঘমেয়াদি সুফল। দিনশেষে পতেঙ্গার এই আয়োজনটি শহরের মানুষের জন্য খুব সহজ কিন্তু জরুরি একটি বার্তাই রেখে গেল—‘গাছ লাগাই, শহর বাঁচাই’।





