মঙ্গলবার – ২৭শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৩ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মঙ্গলবার – ২৭শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৩ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সামনে রমজান, এখন থেকেই হু-হু করে বাড়ছে ‘নিত্যপণ্যের দাম’—দায়ী কারা?

সারাবছর নিত্যপণের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও রমজান ঘনিয়ে এলেই তাতে লোলুপ দৃষ্টি পড়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর। কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করা এ অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য না কমায় সপ্তাহ ব্যবধানে তেল, চিনি, ছোলা ও ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম পাইকারিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এখনই কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা না হলে রমজানে খুচরা বাজারে পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতার কারণে দাম বাড়ছে। অন্যদিকে, ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বাজারে কার্যকর তদারকির অভাবেই এমনটা হচ্ছে।

সরেজমিন নগীরর খাতুনগঞ্জে গিয়ে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে পাইকারি বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সব দিকে বাড়ছে। দেশি পেঁয়াজের দাম এখন কেজিতে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৩৪ থেকে ৩৮ টাকা। ভারতীয় পেঁয়াজও কেজিতে বেড়ে ৬০–৬৫ টাকায় পৌঁছেছে।

রসুনের দামও কেজিতে ১৩০ টাকা, এক সপ্তাহে ৩ টাকা বেড়েছে। আদার কেজি দাম দুই সপ্তাহ আগের ১০০–১০৫ টাকার থেকে এখন ১১০–১১৫ টাকায় উঠেছে। ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৭০–৭৫ টাকায়, ৫ টাকা বেড়ে। ডালের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি—অ্যাংকর ডাল এখন ৪৫–৪৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজারেও প্রভাব পড়েছে। প্রতি মণ (৪০ কেজি) চিনি বেড়ে ৩,৫০০ টাকায়, আর পাম অয়েলের দাম দাঁড়িয়েছে ৫,৯৯০ টাকা। রমজানকে কেন্দ্র করে সেমাইও এখন প্রতি মণে ১,৯৫০ থেকে ২,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আগের দামের তুলনায় ১০০–১৫০ টাকা বেশি।

জানা যায়, অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেন্টের পাশাপাশি  এই মূল্যবৃদ্ধির এই চাপের নেপথ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে সৃষ্ট এক জটিল প্রতিবন্ধকতা।  মূল সংকটের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেল, যেখানে বর্তমানে শতাধিক পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে।

বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষমান এসব জাহাজে ৪৫ লাখ টনের বেশি ভোগ্যপণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি জাহাজে রয়েছে প্রায় ১২ লাখ টন রমজান-সংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্য, যেমন গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ছোলা, ডাল ও ভোজ্য তেল। এছাড়া আরও পাঁচটি জাহাজে রয়েছে ২ লাখ টনের বেশি চিনি। শুধু খাদ্যপণ্যই নয়, সাতটি জাহাজে সার ও ২৪টি জাহাজে সিমেন্টের ক্লিংকার খালাসের অপেক্ষায় দিন গুনছে।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে নদীবন্দর ও টার্মিনালে পণ্য পরিবহন করে সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে খালাস শেষ করা যায়। কিন্তু বর্তমানে লাইটার জাহাজের তীব্র সংকটের কারণে অপেক্ষার সময় কয়েকগুণ বেড়ে ২০ থেকে ৩০ দিনে দাঁড়িয়েছে। অনেক জাহাজ দিনের পর দিন কোনো পণ্যই খালাস করতে পারছে না।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) বলছে, লাইটার জাহাজের চাহিদা সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি। যেমন, ১৩ জানুয়ারি ৯০টি মাদার ভেসেলের পণ্য খালাসের জন্য ১০৪টি লাইটার জাহাজের প্রয়োজন থাকলেও বরাদ্দ দেওয়া গেছে মাত্র ৫০টি।

কার্যকর তদারকি অভাব থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে মুনাফা লোটার সুযোগ পাচ্ছেন বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন।

তিনি বলেন, পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা দুই-তিন মাস আগে থেকেই নিয়মিত তদারকির তাগিদ দিয়ে আসছেন। কিন্তু তদারকি সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীলরা এখন নির্বাচন ও প্রটোকল ডিউটি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটানোর কারণে তেমন একটা তদারকি হচ্ছে না। রমজান আমাদের জন্য ইবাদত ও নাজাতের মাস হলেও অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে এটি কেবলই মুনাফা লোটার মাস। তাদের পুরো টার্গেটই থাকে রমজানকে ঘিরে কীভাবে অতিরিক্ত ফায়দা হাসিল করা যায়।

‘যদি এখনই বাজার মনিটরিং জোরদার না করা হয়, তবে নিত্যপণ্যের অবস্থা এলপি গ্যাসের মতো হবে—যেখানে বলা হচ্ছে সরবরাহ সংকট, অথচ বেশি টাকা দিলেই গ্যাস মিলছে। একইভাবে অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ভোক্তাদের জিম্মি করবে। আমাদের দেশে সাধারণত রমজান শুরু হলে প্রশাসনের তোড়জোড় দেখা যায়, কিন্তু ততক্ষণে বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।’

তবে বাজার পরিস্থিতি ভালো বলে মন্তব্য করেছেন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন । তিনি বলেন, বাজারে পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত এবং বেচাবিক্রি ভালো রয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার দাম কম রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, মাঝখানে দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় এখন কিছুটা বেড়েছে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহাকারী পরিচালক মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে চাহিদার তুলনায় পণ্যের মজুত বেশি আছে এবং এবার আমদানি খরচও কম। ফলে এই মুহূর্তে দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক সুযোগ নেই। কেউ যদি অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করে, তবে আমরা ব্যবস্থা নেব। ভোক্তার অধিকার রক্ষায় আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং চালিয়ে যাচ্ছি; সামনে এটি আরও জোরদার করা হবে।’