চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’–এর কাছে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে ডাকা লাগাতার কর্মবিরতির দ্বিতীয় দিনে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দর। যেখানে প্রতিদিন পাঁচ হাজার পণ্যভর্তি কনটেইনার খালাসা হয় সেখানে গত দুদিন ধরে খালাস হয়নি একটি কনটেইনারও। প্রধান তিন টার্মিনালেও নোঙর করেনি নতুন জাহাজ ফলে জাহাজ থেকে প্রতিদিন গড়ে আট হাজার কনটেইনার ওঠানামা করা জেটিও স্থবির। গত বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বন্দরের জেটি ও টার্মিনালগুলোতে এমন সুনসান নীরবতা বিরাজ করেছে। গত ১৯ বছরে শ্রমিক-কর্মচারীদের এমন কঠোর কর্মসূচি ও বন্দরের এমন স্থবির চিত্র আর দেখা যায়নি।
বন্দরের ৪ নম্বর ফটকসহ সবকটি প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে পণ্যবাহী যানবাহনের দীর্ঘ সারি থাকে, আজ সেখানে কোনো গাড়ির দেখা মেলেনি। বন্দরের অভ্যন্তরে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)—এই তিনটি মূল টার্মিনালেই কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ। জেটিতে থাকা ১১টি জাহাজের ক্রেন গুটিয়ে রাখা হয়েছে, গ্যান্ট্রি ক্রেনের বুমগুলোও (কনটেইনার তোলার হাতল) উপরের দিকে তোলা।
আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে গত ২৪ ঘণ্টায় বন্দরের মূল তিনটি টার্মিনাল থেকে কোনো জাহাজ ছেড়ে যেতে পারেনি, নতুন কোনো জাহাজ ভেড়াও সম্ভব হয়নি। বর্তমানে জেটিতে কনটেইনারবাহী ১০টি এবং কনটেইনারবিহীন পণ্যবাহী ৩টি জাহাজ আটকে আছে। রপ্তানি পণ্যবাহী কোনো কনটেইনার বন্দরে ঢুকতে পারছে না এবং আমদানি পণ্যও খালাস হচ্ছে না।
উল্লেখ্য, বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৯৭ শতাংশই হয় এই তিনটি টার্মিনাল দিয়ে। ফলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মূল বন্দর অচল থাকলেও পতেঙ্গায় সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে পরিচালিত ‘আরএসজিটি চিটাগং টার্মিনাল’-এ কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। সেখান থেকে গতকাল একটি জাহাজ ছেড়ে গেছে এবং আজ আরেকটি ভেড়ার কথা রয়েছে। এছাড়া বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তর (লাইটারিং) কার্যক্রম চালু আছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এনসিটি টার্মিনালটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’–এর কাছে ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এর প্রতিবাদেই ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছে।
সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, “সরকার এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরে না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নামলেও সরকার সমাধানের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।”
অন্যদিকে, ঢাকায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ইজারার আর্থিক বিষয় নিয়ে দর-কষাকষি চললেও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। উল্টো আন্দোলনের জেরে বেশ কয়েকজন কর্মচারীকে বদলি করায় ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে।




