বুধবার – ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৪ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বুধবার – ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৪ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

‘অনারা ক্যান আছন’—বললেন তারেক রহমান

দীর্ঘ দুই দশক পর চট্টগ্রামের কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে যোগ দিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে বক্তৃতার সূচনা করলেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। রবিবার (২৫ জানুয়ারি) দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে পলোগ্রাউন্ড মাঠে প্রবেশ করে তিনি সমবেত লাখো জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘অনারা ক্যান আছন (আপনারা কেমন আছেন)?’ এ সময় উপস্থিত নেতাকর্মীরা সমস্বরে ‘ভালা আছি’ বলে উত্তর দেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আয়োজিত এই বিশাল সমাবেশে তারেক রহমান আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি দুর্নীতি দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে কঠোর ও সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন।

চট্টগ্রামের সঙ্গে আবেগ ও বিএনপির দায়বদ্ধতা

বক্তৃতার শুরুতে তারেক রহমান চট্টগ্রামের সঙ্গে তার দলের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, এই সেই চট্টগ্রাম, এই সেই পুণ্যভূমি, যেখান থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং এই মাটিতেই তিনি শহীদ হয়েছেন। এই চট্টগ্রামেই খালেদা জিয়াকে ‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। তাই চট্টগ্রামের সঙ্গে আমার এবং আমার পরিবারের এক গভীর আবেগের সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলন সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছে। বিএনপি একমাত্র দল যারা যতবার ক্ষমতায় গিয়েছে, ততবার মানুষের জন্য কাজ করেছে। আগামীতে ক্ষমতায় গেলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে উৎপাদন বাড়ানো হবে এবং কৃষকদের মাঝে ‘কৃষক কার্ড’ পৌঁছে দেওয়া হবে।

দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলায় ‘জিরো টলারেন্স’

তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আগামীতে বিএনপি সরকার গঠন করলে দুটি বিষয়ে কড়াকড়িভাবে নজর দেওয়া হবে—মানুষের নিরাপত্তা ও দুর্নীতি দমন। তিনি বলেন, অতীতে বিএনপি যখন দেশ পরিচালনা করেছে, আমাদের দলের কেউ অন্যায় করলেও আমরা ছাড় দিইনি। আগামীতে সরকারে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বিএনপি দুর্নীতির টুটি চেপে ধরবে। অতীতে বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি দমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই আগামীতে দুর্নীতি করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী ও জলাবদ্ধতা নিরসন

চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খনন কর্মসূচির ঘোষণা দেন বিএনপি প্রধান। তিনি বলেন, বিভিন্ন খাল-নালা বন্ধ হওয়ার কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা খাল কাটতে চাই। আপনারা কি আমাদের সঙ্গে খাল কাটা কর্মসূচিতে যোগ দিতে চান? এছাড়া তিনি চট্টগ্রামে আরও ইপিজেড স্থাপন করে একে প্রকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন।

তরুণদের সঙ্গে ‘পলিসি ডায়ালগ’ ও পরিবেশ ভাবনা

সমাবেশে যোগ দেওয়ার আগে রবিবার সকালে নগরীর রেডিসন ব্লু হোটেলে ‘দ্য প্ল্যান: ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তিনি। সেখানে চট্টগ্রামের ৫০টি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে তিনি আগামী ৫ বছরে সারা দেশে ৫০ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা জানান। বায়ুদূষণ রোধে স্থানীয় নার্সারিগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে এই লক্ষ্য পূরণ করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া তরুণ উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং স্টুডেন্ট লোন চালু করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

নিরাপত্তা বলয় ও উৎসবমুখর পরিবেশ

মহাসমাবেশ ঘিরে চট্টগ্রাম নগরীতে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় দুই হাজার পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। মঞ্চ এলাকাকে ‘রেড জোন’, সাংবাদিকদের জন্য ‘ইয়েলো জোন’ এবং সাধারণের জন্য ‘গ্রিন জোন’—এই তিন স্তরে ভাগ করা হয়েছিল। সমাবেশে চট্টগ্রাম মহানগর ছাড়াও রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজার থেকে নেতাকর্মীরা যোগ দেন। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের ২৩টি আসনের প্রার্থীরা।

সমাবেশে ব্যতিক্রমী উপস্থিতি

সমাবেশস্থলে ধানের শীষের আদলে শরীর সাজিয়ে নজর কাড়েন মীরসরাইয়ের দুই কৃষক দল কর্মী নেপাল চন্দ্র দাশ ও সাইদুল ইসলাম। এছাড়া নিজেদের দাবি জানাতে সমাবেশে যোগ দেন প্রায় ২০০ জন শারীরিক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। বধির সৈয়দ আবুল হাসনাত ও গোলাম মোস্তফা জানান, তারা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরতে চান।