বুধবার – ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৪ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বুধবার – ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৪ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চীন–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যে উল্টো হিসাব, দেশ কি আবারও শুল্কের মুখে?

বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের লেনদেনের হিসাবে উল্টোচিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ মাত্র ১৯৫ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করেছে ৮১৩ কোটি ২৪ লাখ ডলারের পণ্য। ফলে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬১৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা আগের দুই বছরের চেয়ে আরও বেশি। এই উদ্বৃত্তকে কেন্দ্র করে দেশে ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক মহলের মাঝে নতুন করে শুল্ক আরোপের শংঙ্কা বিরাজ করছে।

অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশে বাণিজ্যের ভারসাম্যটাও সম্পূর্ণ উল্টো। দেশটি থেকে বাংলাদেশ মূলত শিল্প-কারখানার যন্ত্রপাতি, কেমিক্যাল, বস্ত্র খাতের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক পণ্য ও আসবাবপত্র আমদানি করছে। তবে বাংলাদেশ চীনে রফতানি করছে খুবই সীমিত পরিমাণ, যা দেশের মোট রফতানির মাত্র এক শতাংশের সামান্য বেশি। এর ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনে ঘাটতি ও যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বৃত্ত মিলিয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্য চিত্র আন্তর্জাতিক বাজারে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি ও ট্রাম্প-পরবর্তী বাণিজ্য নীতি অনুসারে, বাংলাদেশের রফতানি পুনরায় শুল্কের মুখে পড়তে পারে। ব্যবসায়ীরা সতর্ক, কারণ ঘাটতি–উদ্বৃত্তের এই অসম ভারসাম্য শুল্ক চাপ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে।

শুল্ক বাড়ানোর কোনো শঙ্কা আছে কিনা, তা নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ন্ত দেখালেও এটা আগামীতে বাড়বে বলে মনে হয় না। কারণ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমছে। বিপরীতে আমাদের আমদানি বাড়বে। আমদানির জন্য দেশটির সঙ্গে যে চুক্তিগুলো হয়েছে, সেগুলো এখনো বাস্তবায়নে যায়নি। সরকার ছাড়াও বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির জন্য চুক্তি করেছে। চুক্তিভুক্ত পণ্যগুলো এখনো বাংলাদেশে পৌঁছেনি। এছাড়া পোশাক রফতানিকারকরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে নেয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হলে এ বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসবে। তবে এটি দৃশ্যমান হতে আরো পাঁচ-ছয় মাস সময় লাগতে পারে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোর তথ্য বলছে, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম ১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৯৫ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। বিপরীতে একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৮১৩ কোটি ২৪ লাখ ডলারের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে। সে হিসাবে গত বছর অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬১৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার। যেখানে ২০২৪ সালের পুরো বছর শেষে এ বাণিজ্য ঘাটতি ৬০৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলারে সীমাবদ্ধ ছিল। এর আগে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৬০২ কোটি ৩৩ লাখ ডলার।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট আমদানি ব্যয়ের বড় একটি অংশই এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, এলপিজি, পুরনো লোহার টুকরো (রড তৈরির প্রধান কাঁচামাল), ক্লিংকার (সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল), অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, সার, অপরিশোধিত চিনি, তুলা (বস্ত্র খাতের কাঁচামাল), গম, পাম তেল, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের দখলে। এসব পণ্য আমদানির সবচেয়ে বড় বাজার হলো চীন।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে ইস্পাতের কাঁচামাল, খনিজ জ্বালানি, তেলবীজ, তুলা ও বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য। আমদানির এ তালিকায় এখন গম, ভুট্টা ও সয়াবিনের মতো খাদ্যপণ্য যুক্ত হয়েছে। আর কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি হলেও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় পরিসরে জ্বালানিটি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেবল পণ্য আমদানি বাড়ালেই হবে না, সেসব পণ্যের হিসাব যাতে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য হিসেবে স্বীকৃত হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এসব কেনাকাটায় অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি থাকছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম কেনার ক্ষেত্রে চুক্তি হয়েছে সিঙ্গাপুরের কোম্পানির সঙ্গে। তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানির মাধ্যমে আমদানীকৃত পণ্য যাতে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য হিসেবে পরিসংখ্যানে স্থান পায়, সেটি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের যে পরিসংখ্যান দেখানো হচ্ছে সেটা পঞ্জিকাবর্ষের (ক্যালেন্ডার ইয়ার)। আর আমরা যেভাবে ম্যাপিং করি সেটা অর্থবছর (ফাইন্যান্সিয়াল ইয়ার)। আমাদের বিশ্লেষণে দেখছি, আমরা বাণিজ্য আলোচনায় সম্পৃক্ত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমছে। ঘাটতি কমিয়ে আমরা বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়াতে চাচ্ছি। আশা করছি, প্রতিযোগী দেশের তুলনায় আমরা যদি প্রেফারেন্সিয়াল মার্কেট অ্যাকসেস পাই, তাহলে আমাদের বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়বে। এর মাধ্যমে উভয় দেশের বাণিজ্যের যে ঘাটতি সেটি কমবে। আর আমরা উভয় দেশই এটি থেকে লাভবান হতে পারব।’

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের চেয়ে প্রতিবেশী ভারত ও চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা শুল্কের হার অনেক বেশি। এ কারণে শুল্ক বাড়লেও গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে ইউরোপের বাজারে আমাদের পণ্য রফতানি কমে গেছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও রাতারাতি এ বাণিজ্য ঘাটতি কমে যাওয়া সম্ভব হবে না। আশা করছি, সরকার ও বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা নিজেদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেবে। এক্ষেত্রে উভয় দেশই উপকৃত হবে।’

প্রসঙ্গত, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি দ্বিতীয় মেয়াদে ফের সক্রিয় হওয়ার পর, বিশ্বের অনেক দেশের পণ্যে উচ্চ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়। ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ৫৭টি দেশের পণ্য আমদানি পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন হারে এই শুল্ক বসায়। বাংলাদেশও এর বাইরে ছিল না। শুরুতে দেশের পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক ৩৭ শতাংশ হলেও, বাংলাদেশের কূটনৈতিক আলোচনার ফলে এটি ২০ শতাংশে নামানো সম্ভব হয়। শুল্ক হ্রাসের পরে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি বাড়ানো হয়, যাতে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এই প্রক্রিয়া দেশটির বাণিজ্যিক কৌশল ও আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।