চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কার্যকর নগর সরকার প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় চট্টগ্রামসহ অন্যান্য অঞ্চল ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়েছে। এ কেন্দ্রীভবনের ফলেই প্রশাসনিক সমন্বয় দুর্বল হয়েছে ও উন্নয়ন সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
বন্দর নগরীর র্যাডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউর মেঘলা হলে গতকাল ‘চট্টগ্রাম কবে বাণিজ্যিক রাজধানী হবে’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। দৈনিক প্রথম আলো আয়োজিত এ বৈঠকে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অংশ নেন।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের অজান্তেই সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা যেখানে কেন্দ্রীভূত হয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতাও স্বাভাবিকভাবেই সেদিকে চলে যায়।’
চট্টগ্রামে নগর সরকার না থাকায় বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় হচ্ছে না দাবি করে চীনের সাংহাই শহরের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘সেখানে নগর সরকার থাকায় মেয়রের নেতৃত্বে সব সংস্থার কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করতে হলে একই ধরনের বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। ঢাকায় না গিয়ে কীভাবে কাজ করা যায়, সেটার একটি তালিকা করলেই অনেক সমস্যার সমাধান হবে। ব্যাংক ঋণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য এখনো ঢাকায় গিয়ে তদবির করতে হয়। এতে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছেন।’
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরো বলেন, ‘ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ হলে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হবে, আমলাতন্ত্র দুর্বল হবে ও জনগণের ক্ষমতা বাড়বে। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চট্টগ্রামের উপকূলীয় সুবিধা অনন্য। দেশের অন্য কোনো অঞ্চলে এমন প্রাকৃতিক সুবিধা নেই। কিন্তু পরিকল্পনার অভাবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।’ এ সময় তিনি রেল, সড়ক ও নদীপথের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
গোলটেবিল বৈঠকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘রাষ্ট্র যতক্ষণ না চট্টগ্রামকে ধারণ করবে, ততক্ষণ চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হবে না। ২০০৩ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণার পাশাপাশি কিছু সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলো সেগুলোর বাস্তবায়ন করেনি।’
নগর সরকার ছাড়া কোনো শহরকে পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘খাল সংস্কারের দায়িত্ব সিটি করপোরেশন থেকে সরিয়ে সিডিএর হাতে দেয়ার সিদ্ধান্ত ছিল নৈতিকতাবিরোধী। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এখন প্রস্তুতি ছাড়াই সিটি করপোরেশনের ওপর চাপানো হয়েছে।’ শাহাদাত হোসেন এ সময় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় বা আট লেনে উন্নীত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
বৈঠকে প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াত সময় আড়াই ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হলে দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে।’ এ সময় তিনি ডেডিকেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও সরাসরি রেল যোগাযোগ চালুর প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি নদীপথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সেলিম রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রামে এখন ভালো মানের হোটেল থাকলেও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও বিমানবন্দর কানেক্টিভিটির ঘাটতির কারণে বিদেশী ক্রেতারা আসতে আগ্রহী হন না।’ সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক রেখে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বানানো সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বৈঠকে টিকে গ্রুপের গ্রুপ পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক সুবিধা ও বাজার ব্যবস্থা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় চট্টগ্রাম পিছিয়ে পড়েছে। ঢাকার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে এখন চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্যোগ নেয়া জরুরি।’ তিনি কোস্টাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডোর গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন।
জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, ‘চট্টগ্রাম যদি বাণিজ্যিক রাজধানী হয়, তাহলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোকেও এখানে আনতে হবে।’ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বাড়তি চাপ ও নদীপথের অপ্রয়োগ ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি করবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
প্যাসিফিক জিন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, ‘চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক রাজধানী করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ভিশন দরকার। সরকার, সিটি করপোরেশন, বন্দর, সিডিএসহ সব সংস্থাকে একই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।’
বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য জাফর আলম বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরই বাণিজ্যিক রাজধানীর মূল ভিত্তি। কিন্তু পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতে সমন্বয়ের অভাবে বন্দর তার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না।’
গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘১৯৯২ সাল থেকে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার কথা আলোচিত হলেও বাস্তবায়নের উদ্যোগ ছিল দুর্বল। নির্বাচনের আগে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আনতেই এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।’
বৈঠকে আরো বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান, পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সাধারণ সম্পাদক স্থপতি জেরিনা হোসেন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক তুনাজ্জিনা সুলতানা ও ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের অধ্যাপক অনুপম দাশগুপ্ত।





