ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের গাজিয়াবাদে তিন কিশোরী বোনের বহুতল ভবন থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনায় উঠে এসেছে নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য।
প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ‘গণ-আত্মহত্যা’ হিসেবে দেখা হলেও, এক প্রতিবেশী প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় ভিন্ন ইঙ্গিত মিলেছে। তাঁর দাবি, এক বোন ঝাঁপ দিতে উদ্যত হলে বাকি দুইজন তাকে বাঁচাতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত নিচে পড়ে যেতে পারে।
গতকাল মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটে গাজিয়াবাদের ভারত সিটি আবাসনের একটি বহুতল ভবনে এ ঘটনা ঘটে। নিহত তিন বোন হলেন, বিশিকা (১৬), প্রাচী (১৪) ও পাখি (১২)।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী অরুণ সিং ভারতীয় গণমাধ্যমকে জানান, রাত ২টার দিকে নিজের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তিনি পাশের ব্লকের নবম তলার একটি ব্যালকনিতে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখতে পান।
তিনি বলেন, “প্রথমে মনে হয়েছিল পারিবারিক কোনো অশান্তি চলছে। দেখি একজন রেলিংয়ে উঠে ঝাঁপ দিতে চাইছে, আর আরেকজন তাকে টেনে নামানোর চেষ্টা করছে। একবার নামাতেও সক্ষম হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার ওই কিশোরী রেলিংয়ে উঠে বসে। তখন আরেকজন এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। আমি ফোন বের করার আগেই তিনজন একসঙ্গে নিচে পড়ে যায়।”
অরুণ সিংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দৃশ্যটি দেখে মনে হচ্ছিল একজন আত্মহত্যায় মরিয়া ছিল, আর বাকি দুইজন তাকে বাঁচাতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যায়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগেছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “যেখানে ১০ মিনিটে খাবার বা গ্রোসারি পৌঁছে যায়, সেখানে জীবন বাঁচাতে অ্যাম্বুলেন্স আসতে এক ঘণ্টা লাগা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।”
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি আট পাতার সুইসাইড নোট এবং একটি পকেট ডায়েরি উদ্ধার করেছে। ডায়েরিতে অনলাইন গেমিং ও মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত আসক্তির কথা উল্লেখ রয়েছে। তদন্তে জানা গেছে, তিন বোনই একটি কোরিয়ান টাস্ক-ভিত্তিক অনলাইন গেমে মারাত্মকভাবে আসক্ত ছিল। এমনকি তারা নিজেদের নাম পরিবর্তন করে কোরিয়ান নামও ব্যবহার করত।
নিহতদের বাবা চেতন কুমার কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, গত দুই বছর ধরে মেয়েরা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। তিনি বলেন, “ওরা বলত- কোরিয়া আমাদের জীবন, কোরিয়া আমাদের ভালোবাসা। তোমরা যা-ই বলো, আমরা এটা ছাড়ব না।” পরিবারের পক্ষ থেকে মোবাইল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করলে তারা মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা কিশোরীদের শোয়ার ঘরের দেয়ালে বিষণ্নতার নানা বার্তা খুঁজে পেয়েছেন। দেয়ালে লেখা ছিল, আমি খুব একা এবং হৃদয় ভেঙে চুরমার। সুইসাইড নোটে লেখা, এই ডায়েরিতে যা লেখা আছে তা সত্যি। সবটা পড়ে নিও। সরি পাপা। নোটের শেষে হাতে আঁকা একটি কান্নার ইমোজিও পাওয়া গেছে।
পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, মেজ বোন প্রাচী এই ঘটনার কেন্দ্রে থাকতে পারে। ব্যালকনির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল এবং চার ফুট উঁচু রেলিং টপকাতে একটি ছোট টুল ব্যবহার করা হয়েছিল।
তবে এটি দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত আত্মহত্যা তা নিশ্চিত হতে পুলিশ সংশ্লিষ্ট অনলাইন গেমের উৎস, কিশোরীদের ডিজিটাল কার্যকলাপ এবং যোগাযোগের ইতিহাস খতিয়ে দেখছে।
ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় শোক ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। খবর: টাইমস অব ইন্ডিয়া





