কাপ্তাই লেকের শান্ত-নীল জলরাশি এবং পাহাড়ি সবুজের বুকে গড়ে উঠা এক অপরূপ নিভৃত পরিবেশ হলো ‘শীলবাড়ি হেঁশেল’। যেন প্রকৃতির বুকের উপর আঁকা এক শান্ত-নান্দনিক কবিতা। এটি মূলত প্রকৃতির মাঝে বসে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খাবার উপভোগ করার একটি মার্জিত স্থান, আবেগঘন আশ্রয়। সবুজ পাহাড়, শীতল বাতাস আর শান্ত জলের নীরবতা—এ তিনের মেলবন্ধনে গড়ে উঠা শীলবাড়ি হেঁশেল দূর থেকে দেখলে মনে হয়, প্রকৃতি নিজেই তার প্রিয় মানুষগুলোর জন্য এ রিসোর্টকে যত্ন করে সাজিয়েছে। চারদিকে সবুজের অবারিত আচ্ছাদন, মাঝখানে স্বচ্ছ লেকের শান্ত জল, তার বুকের ওপর ভেসে থাকা পরিবেশবান্ধব কাঠ ও বাঁশের খোলা কটেজ—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন হয়ে উঠেছে ভালোবাসার এক অনন্য নাম। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক স্বপ্নময় ঠিকানা।

শীলবাড়ি হেঁশেলের প্রতিটি কটেজে রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক অনন্য শিল্পরূপ। গায়ে লেপ্টে আছে প্রকৃতিরই রং। কাঠ আর বাঁশের নির্মাণশৈলী যেন বলছে, আধুনিকতা থাকুক কিন্তু পাহাড়ের মাটির গন্ধ যেন হারিয়ে না যায়। ভেতরের সাদা ও হালকা রঙের জর্জেট কাপড়ের ছোঁয়া এ সৌন্দর্যকে দিয়েছে অন্যরকম কোমলতা। হালকা বাতাসে যখন সেই কাপড় আলতোভাবে দুলতে থাকে, তখন মনে হয় যেন প্রকৃতির বুকজুড়ে লেকের বুক ছুঁয়ে ভেসে আসা সাদা মেঘ নেমে এসেছে এ শীলবাড়ীতে বিশ্রাম নিতে। যা আগুন্তুকদের মনে ছড়িয়ে দেয় এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

লেকের চারপাশে বসে সময় কাটানো এখানে শুধু বসে থাকা নয়, এটা নিজেকে নতুন করে অনুভবের এক দারুণ অনুষঙ্গ। জলের ওপর আলো-ছায়ার খেলা, পাখির ডাক, দূরে থাকা গাছের পাতায় ভেসে বেড়ানো বাতাসের সুর; সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক স্বর্গীয় নীরবতা। যা অজান্তেই মনকে নিস্তদ্ধ করে দেয়। প্রকৃতির কোমল স্পর্শে শহরের কোলাহল, তাড়া আর ক্লান্তি যেন এখানে এসে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। এক কাপ চায়ের উষ্ণতায়, একটুখানি নীরবতায় আর প্রকৃতির মৃদু আহ্বানে মানুষ যেন আবার নিজেকেই খুঁজে পায়।

শীলবাড়ি হেঁশেল শুধু একটি ইকো-রিসোর্ট নয়, এটি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক নিবিড় সংলাপের সাতকাহন। এখানে আসা মানুষ শুধু ভ্রমণ করে ফিরে যায় না; সঙ্গে করে নিয়ে যায় স্মৃতি, কেউ বা প্রশান্তি আর কেউ বা নীরবতার ভেতর নিজের হারানো এক টুকরো স্বস্তি। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময় লেকের জলে ছড়িয়ে পড়া সোনালি আভা দেখে মনে হয়—প্রকৃতি তার সবচেয়ে সুন্দর কবিতাটি যেন এখানেই লিখে রেখেছেন।
মন শুধু মন ছুঁয়েছে… / ও সেতো মুখ খুলেনি…/ সুর শুধু সুর তুলেছে…/ ভাষা তো দেয়নি…/চোখের দৃষ্টি যেন…/ মনের গীতি কবিতা…/ বুকের ভালোবাসা…/যেথায় রয়েছে গাঁথা…।
শীলবাড়ি হেঁশেলের স্বপ্নদষ্টা ও কর্ণধার রূপ-বিশেষজ্ঞ প্রিয় আমিনা আপু নিজের উচ্চমার্গীয় ভাবনা ও প্রকৃতিপ্রেমের পরাকাষ্ঠা হিসেবে গড়ে তুলেছেন এ ব্যতিক্রমী আয়োজন। মুন্সিগঞ্জের নন্দনকোনা নিজগ্রামে প্রথম ও দ্বিতীয় শাখা সফলতার সাথে গড়ার পর কাপ্তাইয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন শীলবাড়ি হেঁশেলের এ তৃতীয় শাখা।

আমিনা আপুর এ শীলবাড়িতে ভ্রমণের প্রতিটি পরতে পরতে খুঁজে পেয়েছি চোখ ছানাবড়া হওয়ার মতো ব্যতিক্রমী-চিত্তাকর্ষক নান্দনিকতা। দেখে উপলব্ধ হয়েছে, এ শীলবাড়ি হেঁশেলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর স্বকীয়তা। পুরো পরিবেশের চমৎকার সাজসজ্জার পাশাপাশি এখানকার খাবারেও রয়েছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের ছোঁয়া। স্থানীয় গ্রামীণ ও পাহাড়ি রাঁধুনিদের হাতে মাটির চুলায় প্রস্তুত করা খাবারগুলো শুধু স্বাদেই নয়, উপস্থাপনাতেও বহন করছে আঞ্চলিক সংস্কৃতির এক হৃদয়গ্রাহ্য আন্তরিকতা।
কাঠ আর বাঁশের বিশেষ নির্মাণশৈলীতে গড়া এ ইকো-রিসোর্টে গত রমজানে নানান রকমের বাহারি ইফতারে অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য হয়েছিল৷ প্রকৃতির সুনসান নীরবতার মাঝে এ ইফতার করার অভিজ্ঞতাই ছিল একেবার ভিন্নমাত্রার। পাহাড়ি বাতাস, লেকের শান্ত জল আর ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমন্বয়; পুরো আয়োজনকে করে তুলেছিল স্মরণীয় ও আত্মিক প্রশান্তিতে ভরপুর।

আমরা যারা শহর জীবনের কর্মব্যস্ততা, যান্ত্রিকতা আর কোলাহল থেকে একটু দূরে সময় কাটাতে চাই তাদের জন্য কাপ্তাইয়ের এ শীলবাড়ি হেঁশেল হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। এক বাক্যে বলা যায়, প্রকৃতির একান্ত সান্নিধ্যে নিরিবিলি সময় কাটানোর জন্য এ শীলবাড়ি হেঁশেলের জুড়ি মেলা ভার।
এ শীলবাড়ী হেঁশেলের চারপাশজুড়ে বিস্তৃত লেকের স্বচ্ছ জল, পাহাড়ি বাতাসের মৃদু ছোঁয়া আর গাছপালার ছায়া নিমিষেই আপনার মনে গভীর প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি করে দেবে। আমি নিশ্চিত, কেউ একবার গেলে এ স্বর্গীয় আবহের কথা বাকি জীবনেও আর ভুলতে পারবেন না।

তাই পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে কিছু ঝঞ্ঝাটহীন, নির্জন-নিরিবিলি সময় কাটাতে চাইলে শীলবাড়ী হেঁশেল হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণ গন্তব্য; যেখানে প্রকৃতি, নীরবতা আর প্রশান্তি হাত ধরাধরি করে আপনাকে অতিথি হিসেবে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় আছে।
লেখক: সংগঠক ও সমাজচিন্তক







