ছোটবেলা থেকে পাঠ্যবইয়ে পড়ে বড় হয়েছি, বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ। সে-সময় দেশের বেশিভাগ মানুষ দরিদ্র সীমার নিচে বাস করতো। যাদের জীবনে অভাব-অনটনই ছিল নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো। মাঝে মাঝে ভাবি, বাংলাদেশ আসলেই কি দরিদ্র একটি দেশ নাকি এ কথাগুলো মাথায় গেঁথে দিয়ে কৌশলে-মানসিকভাবে আমাদের দরিদ্র করে রাখা হয়েছে যেন আমরা কখনও বড় চিন্তা করতে না পারি।
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘দারিদ্র্য মানবসৃষ্ট’। কথিত আছে—কোনো দেশ বা জাতি জন্ম থেকেই গরিব হয় না; ভুল নীতি, অসম বিনিয়োগ, দুর্বল শিক্ষা, বিশ্ব রাজনীতি এবং মানুষের সম্ভাবনা-সক্ষমতাকে ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত করে রাখার মধ্য দিয়েই গরিব করে রাখা হয়।
বিশ্ব রাজনীতির একটি গোপন উদ্দেশ্য হলো—দরিদ্র দেশগুলোকে দরিদ্র করে রাখা। এবং তা করতেই দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া অর্থনীতির সবচেয়ে খারাপ একটি তত্ত্ব হলো ‘কমপেটেটিভ অ্যাডভান্টেজ’ (তুলনামূলক সুবিধা)। এ তত্ত্ব অনুযায়ী প্রতিটি দেশকে সে কাজেই বিশেষায়িত হতে হবে যা তারা সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পারে; এতে নাকি সবারই উপকার হবে। যেমন কোনো দেশের আবহাওয়া যদি নির্দিষ্ট কোনো ফসলের জন্য উপযোগী হয় তবে সেই ফসলেই তাদের মনোনিবেশ করা। আবার কোনো দেশে যদি মজুরি কম হয়, তাহলে তাদের পোশাক সেলাইয়ের মতো শ্রমঘন কাজে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
এটা একটা প্রোপাগান্ডা। এ তত্ত্বের তিনটি বড় সমস্যার একটি হলো—এটি বর্তমান সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে একটি দেশ যে শিল্পে ভালো শুধু সেটাতেই আটকে থাকতে বলা হয়। এর মাধ্যমে তারা বিকল্প শিল্প গড়ে তোলে না। ফলশ্রুতিতে তারা বার্গেনিং পাওয়ার হারিয়ে ফেলে এবং ক্রেতা দেশের কাছে অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়ে কিন্তু সঠিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ ও র্দীঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে একটা দেশ যে আরও উন্নত কাজ করতে পারে, সেটি এখানে উপেক্ষিত।
আমাদের দেশের উন্নয়নের সিংহভাগই শ্রমনির্ভর খাতে তৈরি। তৈরি পোশাক, নির্মাণ, প্রবাসী শ্রমিক, সস্তা সেবা খাত; এগুলোতেই আমাদের আসল নজর। যদিও এসব আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে সত্যিকার অর্থে একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি কেবল শ্রমঘন খাতের ওপর টিকে থাকে না। যে অর্থনীতি নিজস্ব গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং জ্ঞানভিত্তিক উৎপাদনে অগ্রসর হতে পারে না, সে অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিচের ধাপেই আটকে থাকে। তাই বলা যায়, শ্রম রপ্তানি দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আনা যতটা সম্ভব ঠিক ততটাই অসম্ভব শুধুমাত্র শ্রম রপ্তানি দিয়ে একটি জাতিকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা। অথচ আমাদের দেশ যেন ঘুরেফিরে এখানেই আটকে আছে, রাষ্ট্র-সমাজ চিন্তকদেরও দৃষ্টি নিবন্ধ হয়ে আছে এ একটা স্তরে।
এখানে অনিবার্যভাবে সামনে আসে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও অনেকটা পরীক্ষানির্ভর, মুখস্থ এবং একটি কাগুজে সনদ পাওয়ার দিকে বেশ মনোযোগী। যেখানে শিশুদের মধ্যে চিন্তা করার মতো বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা গড়ে তোলার পরিবর্তে প্রতিযোগিতাই মূখ্য বিষয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশ্নফাঁস, নকল, কোচিং-নির্ভরতা এবং সনদের অবমূল্যায়ন; যা শিক্ষার ভিত দুর্বল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ঠ।
অন্যদিকে আমরা এমন একটা বাস্তবতা তৈরি করছি, যেখানে শিশুরা জন্মের পর থেকেই ধীরে ধীরে কেবল শ্রমবাজারের নিচু স্তরের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ভবিষ্যতে উদ্ভাবক, গবেষক, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ ও নীতিনির্ধারক হতে পারার কথা তাদের কল্পনার বাইরে। যে জাতির শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের চিন্তা করতে শেখায় না, সে জাতি প্রযুক্তি আমদানি করতে পারে কিন্তু প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারে না। এমনও হতে পারে মস্তিস্ক ও শরীর নিয়ে আজ যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হয়েছে তার থেকে কৌশলে মস্তিস্কের সম্ভাবনাকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। যেন সে তৃতীয় বিশ্বের একজন শ্রমিক হিসেবে জন্ম নেয়, বেঁচে থাকে এবং শ্রমিক হিসেবেই মৃত্যুবরণ করে।
শুরু থেকে শুরু
আজকে আমরা যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন দেখি সেটা সম্ভব হবে শিল্পায়ানের মাধ্যমে আর শিল্পায়ানের জন্য আমাদের দরকার দক্ষ জনগোষ্ঠী। দক্ষ জনগোষ্ঠীর জন্য দরকার উন্নত-প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা আর উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত করার জন্য আমাদের দরকার, শারীরিক এবং মানসিকভাবে সুস্থ শিক্ষার্থী ও কর্মী সমাজ।
মানবসম্পদ গঠনের শুরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নয়, এমনকি স্কুলেও নয়; এর শুরু মাতৃগর্ভে। গর্ভকালীন পুষ্টি, ভালো প্রসূতি পরিচর্যা, সুষম খাদ্য, মানসিক বিকাশ এবং প্রাথমিক শিক্ষা; এসবই একটি জাতির ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার ভিত্তি। বাংলাদেশে এ ভিত্তি এখনও দুর্বল। অর্থাৎ যদি শৈশবে শারীরিক-মানসিক বিকাশের জন্য সঠিক পুষ্টি ও শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না দেওয়া হয়, তাহলে পরে শুধুমাত্র স্লোগান দিয়ে ‘স্কিলড ওয়ার্কফোর্স’ তৈরি করা সম্ভব নয়।
দুর্বল পুষ্টি আর শিক্ষা নিয়ে বড় হওয়া প্রজন্মকে হাতে কলমে ভালো দক্ষতা দেওয়া কঠিন হয়। এ কারণেই ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট’ কথাটি যতই বলা হোক, যদি শৈশবের পুষ্টি ও প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি নড়বড়ে থাকে, তবে তার ফল সীমিতই থাকবে।
আশার কথা হচ্ছে, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে একটি আধুনিক, কর্মমুখী এবং মেধাভিত্তিক জাতি গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন। তাঁর মতে, একটি জাতিকে পিছিয়ে দেয় অশিক্ষা নয় বরং ভুল ও বৈষম্যমূলক শিক্ষা। কারিগরি শিক্ষাকে শিক্ষা উন্নয়নের জ্বালানি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি এক সমাবেশে বলেছিলেন, দক্ষ তরুণরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, শুধুমাত্র শিক্ষার এহেন অগ্রগতিই দিয়েই কী প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকাটা আদৌ সম্ভব?
যেখানে UNICEF বলছে, দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর প্রায় ২৮ শতাংশ খর্বাকৃতির এবং ১০ শতাংশ ওয়েস্টিং এ ভুগছে। আরও উদ্বেগের বিষয়; ২০২৪ সালে UNICEF জানিয়েছে — দেশের প্রতি তিন শিশুর মধ্যে দুইজন ‘child food poverty’এর শিকার অর্থাৎ তারা পর্যাপ্ত বৈচিত্র্যময় পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না। প্রায় ১ কোটি শিশু ন্যূনতম পাঁচ ধরনের খাদ্য থেকেও বঞ্চিত।
তাই পরিশেষে বলছি—বীজ যদি ভালো না হয়, তাহলে গাছ ভালো হবে না, গাছ ভালো না হলে ফলও ভালো হবে না। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো সার দিয়েও বরই গাছে তো আর আঙ্গুর ফলানো সম্ভব না। আর যদি বাস্তবতা এর বিপরীত কিছু হয় তাহলে বুঝতে হবে, নেপথ্যে কোনো অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে, যার একমাত্র উদ্দেশ্য যেন এটাই প্রতিষ্ঠা করা—‘‘Every Bangladeshi is born a worker, lives as a worker, dies as a worker.’’







