সকালের মিষ্টি রোদে হাসপাতালের খোলা চত্বরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। সবার মাথায় সাদা ক্যাপ, আর হাতে ধরা সচেতনতামূলক প্ল্যাকার্ড। কোনো প্ল্যাকার্ডে আঁকা মুখের একপাশ বেঁকে যাওয়ার চিহ্ন, কোনোটিতে হাত অবশ হয়ে যাওয়ার ছবি, আবার কোনোটিতে বড় করে লেখা—‘এভরি মিনিট কাউন্টস’ (প্রতিটি মিনিটই মূল্যবান)।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিশ্ব স্ট্রোক দিবস উপলক্ষে বন্দরনগরীর এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামে দেখা গেল এমনই এক সচেতনতামূলক দৃশ্য।
স্ট্রোকের লক্ষণ সহজে চেনা এবং রোগীকে তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্যে ‘অ্যাক্ট-ফাস্ট’ (Act-FAST) ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে এক পেশেন্ট ফোরাম ও র্যালির আয়োজন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে বড় নিয়ামক। সে কথাটিই খুব সহজ করে তুলে ধরলেন এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের চিফ অপারেটিং অফিসার বিনয় কাউল।
পেশেন্ট ফোরামে তিনি বলেন, স্ট্রোক এমন একটি জরুরি অবস্থা, যেখানে সময়ই সবচেয়ে বড় বন্ধু কিংবা শত্রু হতে পারে। রোগীকে নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছালে তার সুস্থতার সম্ভাবনা বাড়বে, আর দেরি করলে বাড়বে ঝুঁকি। তাই স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে ভালোভাবে জানা ও করণীয় সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ব স্ট্রোক দিবস উপলক্ষে এই পেশেন্ট ফোরাম ও র্যালির মাধ্যমে আমরা সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন করতে পারব বলে আশা করছি।
কেন প্রতিটি মিনিটের হিসাব এত গুরুত্বপূর্ণ, তার ব্যাখ্যা মেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কথায়। হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ও কো-অর্ডিনেটর ডা. সোমেন চৌধুরী জানান, বর্তমান বিশ্বে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন স্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকেন।
তিনি আরও বলেন, মুখ বেঁকে যাওয়া, হাত-পা নিস্তেজ অনুভব করা কিংবা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলো সাধারণত স্ট্রোকের ইঙ্গিত দেয়। স্ট্রোক হলে প্রতি মিনিটেই মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট হতে থাকে। তাই সময়মতো হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিলে রোগীর প্রাণ বাঁচানো ও সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
একই সুরে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন এভারকেয়ার হসপিটালস বাংলাদেশের মেডিকেল সার্ভিসেস বিভাগের ডিরেক্টর ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির। তিনি বলেন, এ বছরের প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিটই অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। লক্ষণ বুঝতে দেরি হলে রোগীর সুস্থ হওয়া, এমনকি বেঁচে থাকার সুযোগও কমে যায়। আসুন, সবার সম্মিলিত উদ্যোগে আমরা সাধারণ মানুষকে স্ট্রোক নিয়ে আরও সচেতন করে তুলি।
সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছালে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে কীভাবে রোগীকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব, তা তুলে ধরেন হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. আনিসুল ইসলাম খান। তিনি জানান, স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে বিন্দুমাত্র দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছালে সার্জিক্যাল ইন্টারভেনশন বা থ্রম্বোলাইসিসের মতো আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা অনেক বাড়ানো সম্ভব।
পেশেন্ট ফোরামের এই আলোচনায় অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আমিনুর রহমান (আজাদ) এবং নিউরোলজি বিভাগের অ্যাটেন্ডিং কনসালট্যান্ট ডা. মোহাম্মদ আনোয়ারুল আজিম চৌধুরী।
আলোচনা শেষে হাসপাতালের প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয় এক সচেতনতামূলক র্যালি। এতে অতিথি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পাশাপাশি হাসপাতালের মেডিকেল স্টাফ, রোগীর স্বজন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ‘স্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন, দ্রুত পদক্ষেপ নিন’ এই জীবনরক্ষাকারী বার্তাটি সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়েই শেষ হয় দিনব্যাপী এই আয়োজন।





