বাইরে যখন সন্ধ্যার যান্ত্রিক কোলাহল ঠিক তখনই চট্টগ্রাম শহরের একটি বাড়ির আঙিনায় নেমে এল এক টুকরো স্নিগ্ধ নীরবতা আর শিল্পের মানবিক উষ্ণতা। পায়ের নিচে লালচে ইটের মেঝে, মাথার ওপর থেকে ঝুলে থাকা উষ্ণ-হলুদ আলো আর সবুজের সমারোহ; সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন মুহূর্তেই ভুলিয়ে দেয় বাইরের চেনা পৃথিবীকে। এমনই এক নান্দনিক ও ঘরোয়া পরিবেশে কবি, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিমনা মানুষদের অংশগ্রহণে যাত্রা শুরু করল সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল প্লাটফর্ম ‘কেন্দ্রবিন্দু’।
কবি ডা. জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় উঁচু মঞ্চ আর দর্শকসারির চিরচেনা দূরত্ব ভেঙে লাল ইটের মেঝের ওপর দাঁড়িয়েই শুরু হয় উদ্বোধনী সন্ধ্যার কথামালা। শিল্প-সাহিত্যের নানা দিক ও নতুন এই প্ল্যাটফর্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের ভাবনা ও অনুভূতির কথা জানান কবি ও কথাসাহিত্যিক ওমর কায়সার, উত্তর আধুনিকতাবাদী কবি ও চিন্তক এজাজ ইউসুফী, শ ম বখতিয়ার এবং খালেদ হামিদী।
আড্ডার ছলে একে একে আরও বক্তব্য দেন কবি মুয়িন পারভেজ, ফুয়াদ হাসান, আবৃত্তিশিল্পী শাওন পান্থ, সংগীতশিল্পী সুবর্ণা রহমান, শিল্পী অরূপ বড়ুয়া, ব্রাক আইটি’র চিফ পিপল এ্যান্ড কালচার অফিসার শারমিন সুলতান জয়া এবং সমাজকর্মী সাজিদ হাসান। এসময় বক্তাদের কথায় বারবার উঠে আসে শহরের যান্ত্রিক জীবনে এমন একটি খোলামেলা সৃজনশীল আড্ডার প্রয়োজনীয়তার কথা।

বুধবার সরেজমিন দেখা যায়, নগরীর সুগন্ধা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত ‘কেন্দ্রবিন্দু’তে প্রবেশ করতেই একটা শান্ত ও মায়াবী পরিবেশ দেখে যেন চোখ জুড়িয়ে যায়। চারপাশটা একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, এই আয়োজনের প্রতিটি কোণে জড়িয়ে আছে পুরোনো দিনের মায়া আর প্রকৃতির ছোঁয়া। একপাশের দেয়ালে তাকের ওপর সারি করে সাজানো সেকালের হারিকেন ও পিতলের প্রদীপ, অন্যপাশের দেয়ালে ঝুলছে কাঠের ফ্রেমের পুরোনো দিনের টেলিফোন। আর মূল মঞ্চের পেছনটা যেন আস্ত এক সবুজ বাগান। সাদা জালের ফ্রেমে ঝুলন্ত টব আর লতাপাতার ঠাসবুনটে তৈরি সবুজ দেয়ালের সামনে রাখা হয়েছে ফিরোজা রঙের দুটি কাঠের চেয়ার। মেঝের টবে সাজানো ছোট ছোট গাছ আর নীল ঢেউয়ের ভাস্কর্য যেন পুরো জায়গাটিকে দিয়েছে এক শৈল্পিক রূপ।

কথামালায় চট্টগ্রামের লেখক-সাহিত্যিকদের আড্ডার জায়গার সংকটের কথা তুলে ধরেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ওমর কায়সার। কেন্দ্রবিন্দু’র প্রতিষ্ঠাতা এম তারিকুল ইসলামের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, এখন সূর্য ডুবলে আমার কাছে ফোন আসে—‘কীরে, আজকে কোথায় বসব?’ আমি বলি, আমার বাসায়। বলে, ‘তোর বাসায় লিফট নেই, পাঁচতলায়।’ তাহলে বোস-ব্রাদার্সে? ধুর, এখানে বসার কোনো জায়গা আছে! প্রেসক্লাবের নিচে বাতিঘরে? বাতিঘরে আজকাল অনেক তরুণীর ভিড়। চেরাগীর দিকে? অতক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারব না! এই যে বেদুইনের মতো আমাদের এদিক-ওদিক খুঁজে ফেরা, কোথাও কোনো ঠিকানা নেই; সেখানে স্বপ্নের মতো আপনি একটা জায়গা তৈরি করে দিয়েছেন।
আড্ডার পরিবেশ ও আলোচনার গভীরতা নিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করে ওমর কায়সার আরও বলেন, আজকে এমন একটি জায়গায় বসে আমরা খুব কাছ থেকে নিজেদের চিন্তা ও ভাবনাগুলো ভাগাভাগি করতে পেরেছি। এই যে মুয়িন পারভেজ যে শূন্যতার কথা বলল, তার বক্তৃতা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই অন্তত দুজন অতিথির কথায় তা পূর্ণ হলো—একেবারে অলৌকিক কাণ্ড! এজাজ ইউসুফী বলল উত্তরাধুনিকবাদ নিয়ে, আর সারা বিশ্বের পরিস্থিতি নিয়ে আবেগপ্রবণ ও গম্ভীর বক্তব্য রাখল খালেদ হামিদী।
আমার মনে হচ্ছিল, এর প্রতিটি বিষয় নিয়েই আলাদা একেকটা পর্ব হতে পারে। একদিন শুধু এজাজ তার বেড়ে ওঠা ও ভাবনা নিয়ে বলবে, আরেকদিন আমরা শুধু খালেদ হামিদীর ভাবনাগুলো শুনব। শুরুতে সবুজের এত কাছে, ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এমন মিশেলে গড়া এই শান্ত পরিবেশটা দেখামাত্রই আমার ভেতরের অনেক দিনের ঘুমন্ত কিছু স্বপ্ন জেগে উঠেছে।

আলোচনায় উঠে আসে সাহিত্য ও দর্শনের গভীর তাত্ত্বিক কথাও। উত্তর আধুনিকতাবাদী কবি ও চিন্তক এজাজ ইউসুফী তাঁর বক্তব্যে চট্টগ্রাম থেকে শুরু হওয়া উত্তরাধুনিকতাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।
আক্ষেপ ও অভিজ্ঞতার মিশেলে তিনি বলেন, যখন শুনি চট্টগ্রাম থেকে উত্তরাধুনিকতাবাদের একটা আন্দোলন হয়েছিল এবং সেটি খুব হালে পানি পায়নি, কথাগুলো সঠিক নয়। একবার কাটাবনে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে বসে আছি, এক নব্য তাত্ত্বিক এসে বললেন, ‘এজাজ ভাই, পাঁচ মিনিটে বলেন উত্তরাধুনিকতাবাদ কী?’ প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও পরে বললাম, আগে আধুনিকতা কী সে সম্পর্কে আমাকে পাঁচ মিনিট বোঝান। সে উঠে চলে গেছে! এই হচ্ছে অবস্থা। ১৯৯৩ সালে আমরা একটি লিটল ম্যাগাজিন মানুষের হাতে তুলে দিয়ে এই তাত্ত্বিক কাজটি শুরু করেছিলাম। সেই ৯৩ থেকে আজ ৩৩বছর, আমরা পাঁচটি সংখ্যা করেছি। এরপরও কেউ যদি এমন প্রশ্ন করেন, তবে আর কী বলব!
শিল্পবিপ্লবের ইতিহাসের সাথে আধুনিকতা ও সাহিত্যের সংযোগ ঘটিয়ে এজাজ ইউসুফী আরও বলেন, ১৭৪৭ থেকে ১৭৬০ সালের মধ্যে বাষ্পীয় শক্তির আবিষ্কারে প্রথম শিল্পবিপ্লব এবং একশ’ বছর পর ১৮৮০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎশক্তি ও ইস্পাতের ব্যবহারে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব হয়েছিল। ১৯৬০-এর দশকের শেষে ইন্টারনেটের হাত ধরে আসে তৃতীয় শিল্পবিপ্লব। ২০১৪ সালে জার্মানির একজন অধ্যাপক বলেছেন, আমরা এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। মূলত শিল্পবিপ্লবের হাত ধরেই আধুনিকতার বিকাশ, আর ১৯৩০-এর দশকে উত্তরাধুনিকতাবাদের ধারণা আসে।
আজকের এই ন্যানো টেকনোলজি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আমরা যারা কাব্যচর্চা করি এবং নিজেদের তাত্ত্বিক বলার চেষ্টা করি, তাদের খুব ভালোভাবে জানা উচিত চারটি শিল্পবিপ্লব পেরিয়ে মানবসভ্যতা কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি জানা না থাকলে আমি বলব, কথা খুব কম বলবেন।

কেন এই ‘কেন্দ্রবিন্দু’ গড়ে তোলা, এরপর তার পেছনের গল্প শোনালেন প্রতিষ্ঠাতা এম তারিকুল ইসলাম। এ সময় নিজের শৈশবের কথা মনে করে বেশ রসিকতার সুরেই তিনি বলেন, ছোটবেলায় তো পড়ালেখা বা বই-টই পড়তাম না। সবাই বলত বই পড়ো, যত বই পড়বে তত শিখবে। একটু আগে কবি এজাজ ইউসুফী ভাইও বললেন পাঠ করার কথা। কিন্তু আমি বলি, আমি বই না পড়ে সরাসরি লেখকদের সাথেই থাকি! তাহলে মানুষকে বলতে পারব দেখো, মুই কাগো লগে চলি! বাবা যখন জিজ্ঞেস করেন ওই বইটা পড়েছি কি না, আমি বলি আমি তো লেখককেই চিনি, আমার আর বই পড়ার দরকার নেই।
২০১৩ সাল থেকে শুরু হওয়া কেন্দ্রবিন্দুর যাত্রাপথ ও সৃজনশীল মানুষদের প্রতি নিজের মুগ্ধতার কথা জানিয়ে তারিকুল ইসলাম বলেন, শুরুতে আমি পেইন্টিং একদমই বুঝতাম না। একজনের পরামর্শে ঢাকার গ্যালারিতে ঘুরতে শুরু করলাম কিন্তু ছবির সাথে সংযোগ ঘটাতে পারছিলাম না। পরে রেফারেন্স ধরে সরাসরি শিল্পীদের বাসায় যাওয়া শুরু করলাম।
রফিকুন নবী (রনবী), মুর্তজা বশীর, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালেদ সাহেবের বাসায় গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতাম। তখন দেখলাম, এঁরা তো অন্য জগতের মানুষ! তাঁদের চিন্তাভাবনার ধরনটাই আলাদা। আমার বাবা বিজ্ঞানের মানুষ ছিলেন, তাঁর কাছে দুইয়ে দুইয়ে চারই হতো। কিন্তু সৃজনশীল মানুষদের দুই আর দুই মিলে কী হবে, সেই সংজ্ঞা তাঁরা নিজেরাও জানেন না। রং, রেখা আর শব্দ নিয়ে তাঁদের খেলার পরিসর ও মেধার ব্যাপ্তি বিজ্ঞানের ছাত্রদের চেয়ে অনেক বেশি। সেই মুগ্ধতা থেকেই সৃজনশীল মানুষদের গুণচর্চার জন্য আমার এই ছোট্ট আয়োজন।
আমি তো ভাই ডেকোরেটার্স কোম্পানির মালিকের মতো শুধু চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে দিয়েছি, এখন এই জায়গাটাকে কীভাবে চিন্তাশীল করা যায় এবং এখান থেকে সেরা কাজটা বের করে আনা যায়, তার দায়িত্ব আপনাদেরই। এই আয়োজন থেমে থাকবে না বরং কীভাবে আরও বড় পরিসরে নেওয়া যায় সেটাই ভাবছি।
নিজের পাঠ-অভিজ্ঞতা ও চট্টগ্রামের লেখকদের নিয়ে একটি বড় স্বপ্নের কথাও তুলে ধরেন তারিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের কৈশোরে, যুদ্ধের পরপর বাসায় ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’, ‘ইভা’ কিংবা ‘রুশদেশের রূপকথা’র মতো রাশিয়ান বই থাকত। আরেকটু বড় হয়ে হাতে পেলাম ‘দূরবীন’, ‘কালবেলা’, ‘কালপুরুষ’। ফলে বাংলাদেশকে বোঝার আগেই বইয়ের মাধ্যমে কলকাতার সাথে আমাদের একটা আলাদা সংযোগ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমাদের বয়সী অনেকেরই প্রিয় শহর কলকাতা। পরে হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে আমাদের সাহিত্যের সাথে কিছুটা পরিচয় ঘটলেও নিজেদের মাটির সাথে সেই গভীর সংযোগটা আর হয়ে ওঠেনি।
তাই আমি চাই, কেন্দ্রবিন্দুর মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আমাদের লেখকদের তুলে ধরতে, যাতে নতুন প্রজন্ম নিজেদের দেশ ও মানুষের সাথে যুক্ত হতে পারে। বিদেশি সাহিত্য পড়ার আগে আমি সাহিত্যের মাধ্যমে নিজের দেশটাকে চিনতে চাই। আর চট্টগ্রামের মানুষ হিসেবে আমার একটা অঞ্চলপ্রীতি ও দায় আছে। আমি চাই চট্টগ্রামের লেখকদের এমনভাবে তুলে ধরতে, যেন তাঁরা পুরো বাংলাদেশটা জয় করতে পারেন। মূলত চট্টগ্রামের লেখকদের নিয়ে বাংলাদেশ জয়ের লক্ষ্যেই কাজ করবে ‘কেন্দ্রবিন্দু’।

টানা কথামালার দীর্ঘ আলোচনায় একপর্যায়ে পরিবেশটা যখন খানিকটা ভারী ও গম্ভীর হয়ে উঠেছিল, ঠিক তখনই সুরের জাদুতে বদলে গেল ঘরের পুরো আবহ। জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সুবর্ণা রহমানের কণ্ঠে ভেসে এল চিরসবুজ সেই গান—‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়, একি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু’। তাঁর মিষ্টি গলায় এই কালজয়ী গানের সুর বেজমেন্টের লাল ইটের দেয়াল আর সবুজ লতাপাতার ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তে কেটে গেল সমস্ত জড়তা ও একঘেয়েমি। কিছুক্ষণ আগেও যে শ্রোতারা কিছুটা নীরব ও গম্ভীর হয়ে বসে ছিলেন, গানের টানে নিমেষেই তাঁদের চোখেমুখে ফিরে এল সতেজতা ও প্রফুল্লতা।

উপস্থিত কবি-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে সবাই তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ডুবে গেলেন সেই স্বর্ণালী সন্ধ্যার সুরের মায়ায়। এভাবেই গল্প, তত্ত্বকথা আর গানের মূর্ছনায় চট্টগ্রামের বুকে জন্ম নিল শিল্প-সাহিত্যপ্রেমীদের নতুন ঠিকানা ‘কেন্দ্রবিন্দু’।
আয়োজন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানে আগামীতে বইয়ের পাতার বাইরে লেখকদের সঙ্গে দেখা হবে, ছবির সামনে দাঁড়িয়ে শিল্পীর ভাবনা শোনা যাবে কিংবা কোনো এক সন্ধ্যায় গান থামার পর শুরু হবে নতুন কোনো চিন্তার আড্ডা।





