‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—এ রকম সমবেত ধ্বনিকে সামনে রেখে এ দেশে সর্বদা ধর্মীয় উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই উৎসবের আয়োজনে অংশগ্রহণ করেন। এই বছরও যথারীতি শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপনে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তারই ধারাবাহিকতায় ভিন্ন ভিন্ন ধারার প্রতিফলন ঘটেছে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে। সনাতন ধর্মমতে, শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতি বছর এ শরৎকালে পৃথিবীতে আগমন ঘটে দেবী দুর্গার। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয় এবং শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ তিথিতে দেবীর বোধনের মাধ্যমে মূল উৎসব শুরু হয়ে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে। কারণ তিনি উৎসব শেষে ঠাঁই নেন পূজারির অন্তরে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এ পূজা একই সঙ্গে একটি নিগূঢ় সামাজিক ঐতিহ্যপূর্ণ উৎসব, যা এ বাংলায় আবহমানকাল থেকেই পালিত হয়ে আসছে। এটি বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবও বটে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন বাংলাদেশে এ উৎসব আনন্দঘনভাবে উদযাপিত হচ্ছে, এটাই আমাদের আনন্দের বিষয়।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দুর্গাপূজা ছিল চা-বাগান ও গ্রামকেন্দ্রিক এক আনন্দঘন আয়োজন। প্রায় প্রতিটি গ্রামে পূজা অনুষ্ঠিত হতো এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণ ধর্মীয় ভাবনার ঊর্ধ্বে উঠে সার্বিক সহযোগিতা করতেন। দুর্গাপূজা মণ্ডপের আঙিনায় রামায়ণের কীর্তন, পালাগান ও কবির লড়াই অনুষ্ঠিত হওয়ার দৃশ্যই ছিল গ্রামের সকল মানুষের মাঝে আনন্দঘন এক মহামিলনের কেন্দ্রস্থল।
এছাড়াও দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে মেলাপ্রাঙ্গণে বসত বিভিন্ন রকমের গ্রামীণ মেলা; তাতে নাগরদোলা থেকে আরম্ভ করে মুরগির লড়াই—সবই ছিল বিশাল আয়োজনের অংশ। বিভিন্ন রকমের নারিকেলের সন্দেশ, নাড়ু, নানা রকমের পিঠা-মিঠাই—এসবই ছিল বাংলার শারদীয় উৎসবের প্রধান আকর্ষণ এবং মিলনমেলার চিরচরিত অংশ।
আমার এখনও স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে স্কুলের সনাতন ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের সঙ্গে পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা; আর তাদের বাসায় গিয়ে নারিকেলের নাড়ুর স্বাদ না নিয়ে ঘরে ফিরতাম না। চট্টগ্রামের শপিং কমপ্লেক্সের পেছনে গৌরাঙ্গ বাড়ি পূজামণ্ডপসহ গোলপাহাড় কালীবাড়ি, চট্টেশ্বরী, এনায়েত বাজার সংগীত ভবন, মোমিন রোড, চেরাগী পাহাড়, আন্দরকিল্লা রাজাপুকুর লেন, দেওয়ানজি পুকুর, সদরঘাটস্থ পি কে সেন বাড়ি ছাড়াও হাজারী গলির পূজামণ্ডপের কথা এখনও আমার স্মৃতিতে ঠাঁই করে আছে।
এখন পূজার প্রসাদ হিসেবে দেখা মেলে খিচুড়ি, পোলাও কিংবা মিষ্টি-মিঠাই। ঐতিহ্যবাহী নাড়ু বা সন্দেশের আয়োজন চোখে পড়ে না সেই আগের মতো। শারদীয় উৎসবের উন্মাদনা থাকাটা স্বাভাবিক, তবে উচ্ছৃঙ্খলতা যেন উৎসবকে ব্যাহত করতে না পারে, সেদিকে সবার দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন।
আমার সকল সনাতন ধর্মাবলম্বী বন্ধু ও সোশ্যাল মিডিয়ার শুভাকাঙ্ক্ষীসহ বাংলাদেশের জনগণের মাঝে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হোক। আরও সুসংহত হোক বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা—এই দিনে এমনটাই প্রত্যাশা থাকবে আমার প্রার্থনায়। সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাকুক। সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
লেখক: সমাজকর্মী ও চিন্তক




