লংগদু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ। সকাল থেকেই সেখানে মানুষের ভিড়। কারও হাতে পুরোনো প্রেসক্রিপশন, কারও চোখে দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতা। কেউ এসেছেন ছানির সমস্যায়, কেউ আবার শুধু একবার ভালো করে চোখ পরীক্ষা করানোর আশায়।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করা এসব মানুষের অনেকের কাছেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া সহজ নয়। দূরত্ব, যাতায়াতের ব্যয় কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা;সব মিলিয়ে চোখের সমস্যাকে অনেকেই দিনের পর দিন বয়ে বেড়ান।
শনিবার (৮ আগস্ট) তাদের সেই দূরত্বটুকু যেন কিছুটা কমে গেল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লংগদু জোনের উদ্যোগে লংগদু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বসেছে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসার ক্যাম্প। খাগড়াছড়ি রিজিয়নের আওতাধীন এ আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন লংগদু জোনের জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর মোর্শেদ, এসপিপি, পিএসসি।
একদিনের এ ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন ৭০০ মানুষ। অভিজ্ঞ চক্ষু বিশেষজ্ঞরা তাঁদের চোখ পরীক্ষা করেন, দেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ এবং নানা ওষুধ। কারও হাতে তুলে দেওয়া হয় বিনামূল্যের চশমা। হিসাব কষে দেখা যায়, মোট ২০০ জন রোগী পেয়েছেন চশমা।
এখানেই শেষ নয়। চোখের জটিল সমস্যা কিংবা ছানির কারণে যাঁদের আরও উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন, তাঁদেরও চিহ্নিত করা হয়েছে। এমন ১৭৫ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসা ও ছানি অপারেশনের জন্য চট্টগ্রাম লায়ন্স দাতব্য চক্ষু হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। তাঁদের চিকিৎসার ব্যয় বহন করবে লংগদু জোন।
অর্থাৎ শুধু চোখ পরীক্ষা করে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা নয়, যাঁদের আরও চিকিৎসা প্রয়োজন, তাঁদের পরবর্তী চিকিৎসার পথটিও তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এ আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করে রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং পোর্ট সিটি, রোটারাক্ট ক্লাব অব চিটাগাং লেক সিটি, চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশন এবং লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং প্রোগ্রেসিভ সাউথ।
চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পে উপস্থিত ছিলেন রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং পোর্ট সিটির পিপি ইঞ্জিনিয়ার মোরশেদ আলম, চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সৌমেন তালুকদার ও ডা. শুভ চক্রবর্তী এবং ক্যাম্প কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন।
উল্লেখ্য যে, পার্বত্য অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা পাওয়া অনেকের জন্যই এখনো সহজ নয়। বিশেষ করে চোখের মতো বিশেষায়িত চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা আরও প্রকট। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের কাছাকাছি গিয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার এ উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি তৈরি করেছে।
ক্যাম্পে আসা এলাকাবাসী, স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সমাজসেবকেরা এ উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তাঁরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ সহযোগী রোটারি ও লায়ন্স সংগঠনগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, পারস্পরিক আস্থা ও সম্প্রীতি জোরদারে মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে লংগদুর সচেতন মানুষরা বলছেন, আজকের এ ক্যাম্পে চিকিৎসা কার্যক্রম হয়তো কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়েছে । কিন্তু ৭০০ মানুষের চোখে চিকিৎসার যে স্পর্শ পৌঁছেছে, ২০০ মানুষের হাতে যে নতুন চশমা উঠেছে এবং ১৭৫ জনের জন্য যে উন্নত চিকিৎসার পথ তৈরি হয়েছে; তার প্রভাব আরও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। কারণ কখনো কখনো মানুষের জীবনে আলো পৌঁছে দিতে বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু আলো পৌঁছে দেওয়ার মতো একটি ছোট্ট উদ্যোগ। আজ তাই-ই করে দেখিয়েছি আমাদের গর্বের সেনাবাহিনী, লায়ন্স ও রোটারি ক্লাব।







