মঙ্গলবার – ১১ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ২৭শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মঙ্গলবার – ১১ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ২৭শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোগ থেকে দুর্যোগ—সব সংকটের ‘যোগসূত্র’ পরিবেশ!

মানুষের স্বাস্থ্য, রোগ, দুর্যোগ ও পরিবেশ—কোনোটিই একে অপরের থেকে আলাদা নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, সংক্রামক রোগ ও দুর্যোগের মতো সংকট মোকাবিলায় পরিবেশবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

রোববার (৯ আগস্ট) এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে (AUW) স্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক কর্মশালায় এসব কথা উঠে আসে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য বিভাগের প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী অংশ নেন।

কর্মশালার শুরুতে বক্তব্য দেন পরিবেশবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান কর্মসূচির পরিচালক ড. পলরাজ মোসায়ে সেলভাকুমার। পরে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন একাডেমিক অ্যাফেয়ার্সের সহযোগী ডিন ড. মোহিউদ্দিন আহসানুল কবির চৌধুরী এবং অধ্যাপক ড. হাসিনা খান।

বক্তারা বলেন, তিনটি বিভাগে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বিষয় আলাদা হলেও তাঁদের সামনে থাকা বড় চ্যালেঞ্জগুলো একই জায়গায় এসে মিশেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া রোগ, দুর্যোগ ও পরিবেশের পরিবর্তন—সবকিছুর মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক সম্পর্ক। তাই এসব সংকট বুঝতে ও মোকাবিলা করতে বিভাগভিত্তিক চিন্তার বাইরে যেতে হবে।

দুর্যোগে নারীর ভূমিকা

কর্মশালায় অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন ড. ন্যান্সি মক। তিনি নারীর নেতৃত্ব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি কিংবা সংঘাত—যেকোনো দুর্যোগে নারী ও পুরুষ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। দুর্যোগ ও বাস্তুচ্যুতিতে নারীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকলেও সংকট মোকাবিলায় তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলা ও মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে নারীরা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নারীদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ বাড়ানো শুধু সমতার বিষয় নয়, বরং কার্যকর ব্যবস্থাপনার জন্যও জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলেও আলোচনায় উঠে আসে।

রোগ ছড়ানোর সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক

কর্মশালায় আরেক অতিথি বক্তা ড. এম.এস.এ. মুথুকুমার নাদার Classical Swine Fever Virus (CSFV) নিয়ে আলোচনা করেন। এটি গৃহপালিত ও বন্য শূকরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস, যা প্রাণিসম্পদ ও খাদ্যনিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি দেখান, কোনো ভাইরাস কীভাবে ছড়ায় তা শুধু জীববিজ্ঞানের বিষয় নয়। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, ভূমি ব্যবহার, পশুপালন এবং পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গেও রোগের বিস্তারের সম্পর্ক রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষির ওপর বাড়তে থাকা চাপের কারণে রোগের গতিপথও বদলাতে পারে। তাই রোগ পর্যবেক্ষণে শুধু হাসপাতাল বা পরীক্ষাগারের তথ্য নয়, পুরো পরিবেশব্যবস্থাকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে আলোচনায় উঠে আসে।

আলোচনায় ইকোফেমিনিজম

কর্মশালায় ইকোফেমিনিজম নিয়েও আলোচনা হয়। এই ধারণায় পরিবেশের ওপর মানুষের ক্ষতিকর প্রভাব এবং নারীর ওপর বৈষম্যের মধ্যে সম্পর্ক খোঁজা হয়।

অংশগ্রহণকারীরা বলেন, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সংকটে নারীরা যেমন বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, তেমনি পরিবার ও স্থানীয় পর্যায়ে সংকট মোকাবিলায় তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে দুর্যোগের সময় স্থানীয় মানুষের পাশে দাঁড়ানো—বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অবদান রয়েছে।

তথ্যচিত্রে পরিবেশ সচেতনতার বার্তা

কর্মশালায় পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রেরও প্রদর্শনী ও মূল্যায়ন করা হয়। আয়োজকদের মতে, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি গল্প ও তথ্যচিত্রের মাধ্যমেও পরিবেশগত সংকট মানুষের কাছে সহজে তুলে ধরা সম্ভব। এতে পরিবেশের ক্ষতি, জলবায়ু ঝুঁকি ও স্থানীয় মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তব চিত্র তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তথ্যচিত্র প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পেয়েছে ‘The Last Apology’। এটি নির্মাণ করেছেন ডেনাজিয়া দা সিলভা পিরেস ও হকাউন হতোই আওং। দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছে Who Gets the Privilege to Be Sustainable?—নির্মাতা প্রজ্ঞা চৌধুরী। তৃতীয় পুরস্কার পেয়েছেWhat Do You Know About Green Bangle’s Moringa Initiative?’ এটি যৌথভাবে নির্মাণ করেছেন লাইকা মেহরজাদ, তানুসিরি দেওয়ান, ফারাঙ্গিস পাইয়েজ ও নিশা আগরওয়াল। কর্মশালাটি সমন্বয় ও সঞ্চালনা করেন আসিফা ইসলাম ও আনিকা তাবাসসুম শৌমি।  এবং আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করে হোটেল আগ্রাবাদ।

কর্মশালায় বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় মূলত একটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—স্বাস্থ্য, রোগ, পরিবেশ ও দুর্যোগকে আলাদা করে দেখলে ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে। এসব চ্যালেঞ্জের সমাধানে বিজ্ঞান, পরিবেশ ও সমাজকে একসঙ্গে দেখার বিকল্প নেই।