রবিবার – ২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবিবার – ২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে প্রথম: কাগজ ছাড়াই ‘তালপাতার’ বিজনেস কার্ড নিয়ে এল এউডব্লিউ

প্রযুক্তির অবারিত সুযোগের এ সময়ে আপনার হাতে থাকা বিজনেস কার্ডটি যদি প্লাস্টিক বা কাগজের না হয়ে গাছের ঝরে পড়া তালপাতা দিয়ে তৈরি হয়, কেমন হবে? শুনতে কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও এমনই এক পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবনকে সত্য করে তুলেছেন চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (AUW) একদল গবেষক ও শিক্ষার্থী।

দেশে প্রথমবারের মতো কাগজ বা প্লাস্টিকের কোনো ব্যবহার ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়টি তৈরি করেছে প্রিমিয়াম মানের বায়োডিগ্রেডেবল (প্রকৃতিতে সহজে মিশে যাওয়া) বিজনেস কার্ড।

ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ অ্যান্ড এথিকস কমিটির অর্থায়নে পরিচালিত বছরব্যাপী এক স্টার্টআপ গবেষণা প্রকল্পের সমাপ্তি উপলক্ষে সম্প্রতি এউডব্লিউ (AUW) ক্যাম্পাসে ‘পালমিরা লিফ ইকো-প্রেনারশিপ ওয়ার্কশপ’ আয়োজন করা হয়।

এই কর্মশালায় প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী হাতে-কলমে শিখেছেন কীভাবে পরিত্যক্ত তালপাতাকে আধুনিক বিজনেস কার্ডে রূপান্তর করা যায়।

উদ্যোগটির নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস প্রোগ্রামের পরিচালক ও তালগাছবিষয়ক বিশিষ্ট গবেষক। তাঁর মতে, এটি কেবল একটি নতুন পণ্য তৈরির প্রচেষ্টা নয় বরং অতীতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন।

তিনি বলেন, “কয়েক শতাব্দী আগে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে জ্ঞান সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যমই ছিল তালপাতা। ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে শুরু করে সাহিত্য—সবই লেখা হতো এতে। তামিল সংস্কৃতিতে তালগাছকে বলা হয় ‘স্বর্গীয় বৃক্ষ’। প্রাচীন গ্রন্থ ‘তালা বিলাসম’-এ এই গাছের ৮০১টিরও বেশি ব্যবহারের কথা উল্লেখ আছে। সেই ঐতিহ্য থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েই আমরা আজ পরিত্যক্ত তালপাতাকে আধুনিক রূপ দিচ্ছি।”

যেভাবে তৈরি হয় এই পরিবেশবান্ধব কার্ড

গাছ থেকে ঝরে পড়া বা অব্যবহৃত তালপাতাকে প্রথমে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পরিষ্কার ও সংরক্ষণ করা হয়। এরপর সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তা প্রিন্টিং বা মুদ্রণের উপযোগী করে তোলা হয়। সবশেষে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পাতার ওপর প্রয়োজনীয় তথ্য মুদ্রণ করা হয়। বাংলাদেশে তালপাতার ওপর প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজনেস কার্ড তৈরির এটিই প্রথম উদ্যোগ। গবেষকরা জানান, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র, শুভেচ্ছা কার্ডসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব প্রিন্টিং পণ্য তৈরি করা সম্ভব।

এই গবেষণা প্রকল্পের কারিগরি উন্নয়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রধান গবেষণা সহকারী ও সহকর্মীরা। তাঁদের সঙ্গে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস প্রোগ্রাম এবং ‘গ্রিন ব্যাঙ্গেল মুভমেন্ট’-এর ১০ জন শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দিনরাত কাজ করেছেন। বর্তমানে কার্ডে পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার নিশ্চিত করতে তাঁদের গবেষণা চলমান রয়েছে।

সবুজ অর্থনীতি ও নারী ক্ষমতায়নের নতুন আলো

এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনা। ড. মোসাইয়ের প্রতিষ্ঠিত ‘গ্রিন ব্যাঙ্গেল মুভমেন্ট’-এর আওতায় পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য ও বিনা মূল্যের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে নারীরা অত্যন্ত স্বল্প বিনিয়োগে এই সবুজ ব্যবসা গড়ে তুলতে পারবেন, যা একদিকে পরিবেশ রক্ষা করবে এবং অন্যদিকে গ্রামীণ নারীদের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

ব্যাপক প্রশংসা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই কর্মশালাটি সমন্বয় করেন গ্রিন ব্যাঙ্গেল প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প ব্যবস্থাপক এবং এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী সমন্বয়কারী। অনুষ্ঠানে অতিথিদের হাতে তালপাতায় তৈরি নমুনা বিজনেস কার্ড তুলে দেওয়া হলে তা সবার মাঝে ব্যাপক কৌতুহল ও আগ্রহের জন্ম দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং একাডেমিক অ্যাফেয়ার্সের সহযোগী ডিন গবেষণা দলের এই যুগান্তকারী কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন। অনুষ্ঠান শেষে গবেষক, সহকারী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মাননা সনদ ও ই-সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।

‘দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ’-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এই কর্মশালা থেকে সংগঠনটি প্রযুক্তিটি আরও বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভবিষ্যতে গ্রিন ব্যাঙ্গেল মুভমেন্ট ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের সঙ্গে যৌথভাবে পরিবেশবান্ধব উদ্যোক্তা কার্যক্রম গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।

পরিবেশবিদদের মতে,  প্লাস্টিক দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের এই ক্রান্তিলগ্নে, গবেষণাগারের চার দেয়াল পেরিয়ে বাস্তব জীবনে ব্যবহারযোগ্য এমন পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নয়; এটি স্থানীয় সম্পদের সৃজনশীল ব্যবহার, নারীর ক্ষমতায়ন এবং টেকসই সবুজ উদ্যোক্তা বিকাশের ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার বার্তা।