– 

– 

এক উপহার থেকে যে গল্পের শুরু

খাবারের টেবিলজুড়ে কোথাও ফুলের সূক্ষ্ম কারুকাজ, কোথাও ফরাসি বা ভিক্টোরিয়ান নকশার ছাপ। থরে থরে সাজানো সিরামিকের চায়ের ক্যাটলি, কাপ, বাটি দেখে যে-কারোরই মনে হতে পারে, এটি কোনো পুরোনো ইউরোপীয় বাড়ির ডাইনিং টেবিল। কিন্তু একটু ভালো করে তাকালে পরক্ষণে ধরা পড়ে এক ভিন্ন গল্প-রহস্য। এ সৌন্দর্যের জন্ম ভিন্ন কোনো দেশে নয়, আমাদের বাংলাদেশেই।

সম্প্রতি কাগজের ঘর স্টুডিওসের আয়োজনে বিশেষ হাই টি অনুষ্ঠানে এভাবেই সামনে উঠে আসে দেশের তৈরি সিরামিক পণ্যের এক বিশেষায়িত জগৎ। যেখানে সুন্দর টেবিলওয়্যার প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় কারিগরের দক্ষতা, দেশীয় সিরামিক শিল্পের সাথে বিদেশি নান্দনিকতার মেলবন্ধনে তৈরি এক বহুামাত্রিক বৈচিত্র যেন বিশেষভাবে সবার নজর কেড়েছে।

bKash

চোখ ধাঁধানো এ প্রদর্শিত পণ্যগুলোর একটি সেটে দেখা যায়, রাজকীয় নীল ও শুভ্রতার মিশেলে তৈরি হয়েছে শান্ত অথচ আভিজাত্যপূর্ণ আবহ। গাঢ় নীল কাপড়ের ওপর লেসের ম্যাটে সাজানো চায়ের ক্যাটলি, কাপ, বাটি ও সিরামিকের জগ। পেছনে ভিনটেজ ফ্রেম, টেবিল ল্যাম্প আর ধাতব ফুলদানির উপস্থিতি যেন পুরো আয়োজনটিকে দিয়েছে ইউরোপীয় ভিক্টোরিয়ান রাজপ্রাসাদের আবহ। নীল-সাদার সেই বিন্যাসে সিরামিকের সূক্ষ্ম নকশাগুলো যেন হয়ে ওঠেছে আরও স্পষ্ট, আরও চিত্তাকর্ষক।

অন্য একটি পণ্যে আবার নান্দনিকতার ভাষা ছিল ভিন্ন। কাঠের উষ্ণ ব্যাকগ্রাউন্ডে রাখা আধুনিক কফি সেটটির কাপজুড়ে রয়েছে পেঁচানো লতাপাতা এবং লাল-সোনালি ফরাসি নকশা। বিশেষভাবে তৈরি প্ল্যাটার-প্লেটটির নকশাতেও রয়েছে অভিনবত্ব, স্ন্যাকস কিংবা আঙুল রাখার জন্য সূক্ষ্ম গর্তের ব্যবস্থা। পাশে কাঁচের পাত্রে সাদা ফুল আর নরম আলো পুরো দৃশ্যটিকে দিয়েছে আরও কোমল আবহ। বলা যায়, ব্যবহারিকতার সঙ্গে নান্দনিকতার এ মেলবন্ধনই পণ্যটিকে সাধারণ কফি সেটের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।

তবে এই গল্প শুধু সিরামিকের নকশা কিংবা সৌন্দর্যের নয়। এর পেছনে রয়েছে একজন উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত শ্রম-ত্যাগ, মেধা এবং বাবার কাছ থেকে পাওয়া বিশেষ এক অনুপ্রেরণা।

এ উদ্যোক্তার নাম মাশরুফা বাশার। যিনি কাগজের ঘর স্টুডিওসের স্বত্বাধিকারী। মাশরুফা বাশার ট্রেড ট্রিবিউনকে জানান, কোনো ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত থেকে তিনি এ উদ্যোগ নেননি। গত বছর বাবা তাঁকে এ প্রকল্পের মূল কাঠামোটি ‘সারপ্রাইজ উপহার’ হিসেবে দিয়েছিলেন।

বাবাকে নিজের ‘সুপার হিরো’ হিসেবে উল্লেখ করে মাশরুফা আরও জানান, তাঁর এ কাজ তিনি বাবাকেই উৎসর্গ করতে চান। বাবার দেওয়া উপহারকে তিনি শুধু ব্যবসার ভিত্তি হিসেবে না দেখে বরং সেটিকে নিয়েছেন ভালোবাসা, আশীর্বাদ ও এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হিসেবে। তাই এটিতে নিজের ভালোবাসা, শ্রম ও সৃজনশীলতা ঢেলে দিয়ে একটি স্বতন্ত্র উদ্যোগে রূপ দিয়েছেন তিনি। বাবার পরামর্শ ও উপস্থিতিকে প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করার কথা জানিয়ে তিনি বিশ্বাস করেন, বাবা দূর আকাশ থেকেও তাঁকে দেখছেন এবং আশীর্বাদ করছেন।

মাশরুফা বাশারের এ পথচলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি শুধু কাপ-প্লেট বা ক্রোকারিজে থেমে থাকেননি। ছিল হাতে তৈরি ডিকুপাজের কাজও। তারওপর এর ভেতরে আছে সূক্ষ্ম নকশা, ধৈর্য আর নিখুঁত হাতের কাজ; যা এসব পণ্যকে ব্যবহারিক জিনিসের সীমানা ছাড়িয়ে ছোট ছোট শিল্পকর্ম পরিণত করেছে।

সেদিন হাই টি অনুষ্ঠানে অতিথিদের সামনে পরিবেশন করা হয়েছিল নানা ধরনের হালকা খাবার ও নোনতা স্ন্যাকস। টেবিলটি সাজানো হয়েছিল এমনভাবে, যাতে সেখানে রাখা প্রতিটি সিরামিক পণ্যের সৌন্দর্য আলাদা করে চোখে পড়ে। ফলে অতিথিরা শুধু পণ্যগুলো দেখেননি বরং যে কাজে এগুলো তৈরি, সেই পরিবেশেই সেগুলোকে অনুভব করার সুযোগ পেয়েছেন।

এ আয়োজন ঘিরে লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, একটি কাপ বা প্লেট সাধারণত আমাদের চোখে কেবল ব্যবহারিক জিনিস। কিন্তু সুন্দরভাবে সাজানো একটি টেবিলে, খাবার ও চায়ের পাশে যখন সেসব পণ্য সাজিয়ে রাখা হয় তখন পরিচয় একটু হলেও বদলে যায়। ব্যবহারি পণ্য আর শিল্পের মেলবন্ধন যেন মানুষ অন্যরকমভাবে উপভোগ করে।

পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল স্বাচ্ছন্দ্য কিন্তু পরিশীলিত একটি আবহ। খুব বেশি আনুষ্ঠানিকতা নয় আবার একেবারে সাধারণও নয়। ঐতিহ্যবাহী হাই টি-র আবহের সঙ্গে সিরামিকের ভিনটেজ নকশা মিলে তৈরি হয়েছিল এমন এক পরিবেশ, যেখানে অতিথিরা পণ্যের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর পেছনের কারিগরি দক্ষতাটিও উপলব্ধি করেছিল প্রাণভরে।

তবে মাশরুফার এ পথচলায় তিনি একা নন। এ যাত্রায় তাঁর মা এবং উৎসাহ দিয়ে আসা অন্যান্য নারীদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। পরিবার, বন্ধু এবং তাঁর কাজের ওপর আস্থা রাখা অনুরাগী ও ক্রেতাদের ভালোবাসা ও সমর্থনকেও তিনি এই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন।

দর্শনার্থীরা বলছেন, দেশে তৈরি একটি পণ্যের নকশায় যখন ফরাসি, ইউরোপীয় কিংবা ভিক্টোরিয়ান সৌন্দর্যবোধ এসে মিশে যায় আর সেই নকশা বাস্তবে রূপ দেন এ দেশেরই কোনো কারিগর তখন সেটি শুধু একটি টেবিলওয়্যার থাকে না। হয়ে ওঠে সংস্কৃতি, কারুশিল্প ও আধুনিক রুচির এক মিলিত গল্প। কাগজের ঘর স্টুডিওসের এ আয়োজন যেন সেই গল্পটিই আমাদের সামনে তুলে ধরেছে।

তারওপর দেশের মাটি দিয়ে তৈরি জিনিসের সৌন্দর্যকে নতুন চোখে দেখার এ গল্পের ভেতর যখন নিঃশব্দে জড়িয়ে থাকে একজন বাবার ভালোবাসা, একটি ‘সারপ্রাইজ উপহার’, যা মেয়ের হাতে এসে পায় নতুন জীবন তখন সিরামিকের প্রতিটি পণ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি অনুভূতি; নিজের দেশের কারুশিল্প, সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনাকে নতুন করে দেখার অনুভূতি। তখন এ মুগ্ধতা, সৃজনশীলতা নিঃসন্দেহে মানুষের মনোজগতে দেশাত্ববোধ, দেশপ্রেম আর দেশীয় পণ্য ব্যবহারে আবেগ-ভালোবাসা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।