– – 

– – 

শুল্কের নতুন দেয়াল, কোন পথে উত্তর আমেরিকার গাড়ি শিল্প?

উত্তর আমেরিকার কোনো মহাসড়কে কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রগামী যন্ত্রাংশবোঝাই একটি ট্রাককে দেখলে সেটিকে সাধারণ আমদানি পণ্য পরিবহন বলেই মনে হতে পারে। বাস্তবে সেই ট্রাকে থাকা কোনো যন্ত্রাংশের গল্প হয়তো আরও দীর্ঘ। তার কাঁচামাল এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে, কানাডার কারখানায় সেটি যন্ত্রাংশে রূপ নিয়েছে, এখন আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছে। সেখানে আরেকটি অংশের সঙ্গে সংযোজিত হয়ে শেষ পর্যন্ত জায়গা করে নেবে একটি নতুন গাড়িতে। উত্তর আমেরিকার অটোমোবাইল শিল্পের বৈশিষ্ট্যই এমন। এখানে একটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটি পণ্যের শেষ নয় গন্তব্য , বরং উৎপাদনের পরবর্তী ধাপ।

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর অটো শিল্প এ আন্তঃনির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে এক অসম্ভব কার্যকরী কিন্তু জটিল উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কোন যন্ত্রাংশ কোন দেশে তৈরি হচ্ছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল কোথায় সেটি সবচেয়ে দক্ষ ও সাশ্রয়ীভাবে তৈরি করা সম্ভব এবং কত কম খরচে তা মূল উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যাবে। কিন্তু নতুন করে সেই হিসাবের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে একটি পুরোনো শব্দ—শুল্ক।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ১৯৩০ সালের শুল্ক আইনের ৩৩৮ ধারা ব্যবহার করে কানাডার নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, মোটরযানের ক্ষেত্রে কানাডার বাণিজ্যিক ব্যবস্থা মার্কিন বাণিজ্যের প্রতি বৈষম্যমূলক। এ যুক্তিতেই নির্দিষ্ট কানাডীয় পণ্যের বিরুদ্ধে ৩৩৮ ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে।

bKash

পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বরের ঘোষণায় মোটরযান-সংশ্লিষ্ট পণ্যের তালিকায় পরিবর্তনও আনা হয়েছে। কিছু পণ্য অতিরিক্ত শুল্কের আওতায় রয়েছে, কিছু পণ্য তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তাই বিষয়টি ‘কানাডার পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক’—এ একটি বাক্যে ব্যাখ্যা করা হয়তো কিছুটা অসম্পূর্ণই হবে। এ আপাত অসম্পূর্ণ তথ্যটি আমাদের ঠেলে দেয় সেই এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে—শুল্ক দীর্ঘস্থায়ী হলে উত্তর আমেরিকার অটো শিল্প কি তার বহু বছরের উৎপাদন ও সরবরাহের কাঠামোই নতুন করে সাজাতে শুরু করবে?

সম্প্রতি আরোপিত ৩৩৮ ধারা আসলে নতুন কিছু নয়, প্রায় এক শতাব্দী পুরোনো মার্কিন শুল্ক আইনের অংশ। কোনো দেশ মার্কিন বাণিজ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত মূল্যভিত্তিক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সংবিধান মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দিয়েছে। বর্তমান অটো-বাণিজ্য বিরোধে এ ধারার ব্যবহারও তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ৩৩৮ ধারার শুল্ক সাধারণ আমদানি শুল্ক নয়, এটি অতিরিক্ত ব্যবস্থা। কোনো একটি পণ্যের সাধারণ শুল্কহার কম বা শূন্য হলে তাই ৩৩৮ ধারার অতিরিক্ত শুল্ক থেকেও সেটি মুক্ত হবে, ব্যাপরটা মোটেও তা নয়। আর এখানেই সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তি বা ইউএসএমসিএ।

উত্তর আমেরিকার অটোমোবাইল শিল্পের বড় অংশ এ চুক্তির বাণিজ্যসুবিধাকে সামনে রেখে নিজেদের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা সাজিয়েছে। এ চুক্তি সাবেক নাফটা চুক্তির আরো সম্প্রসারিত রূপ। চুক্তি মতে, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা; এ তিনদেশের কোনো একটিতে শর্তসাপেক্ষে উৎপাদিত পণ্য বাকি দুটি দেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। নতুন আইন অনুসারে একটি পণ্য ইউএসএমসিএর অধীনে অগ্রাধিকারমূলক শুল্কসুবিধার যোগ্য হওয়া এবং সেটি ৩৩৮ ধারার অতিরিক্ত শুল্কের আওতায় পড়া—দুটি আলাদা প্রশ্ন।

ফলে আমদানিকারকদের জন্য হিসাব আগের তুলনায় অনেক জটিল হয়ে উঠেছে। একটি গাড়ি আসলে কত দেশের? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই বর্তমান সমস্যার গভীরতা বোঝা যায়। ধরা যাক, কানাডার অন্টারিওতে একটি গাড়ির আসনের কাঠামো তৈরি হলো। সেটি সীমান্ত পেরিয়ে ওহাইওর একটি কারখানায় এলো। সেখানে ফোম, কাপড়, মোটর ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ যুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ আসন তৈরি হলো। এরপর সেই আসন পাঠানো হলো মিশিগানের একটি গাড়ি সংযোজন কারখানায়। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

কানাডায় তৈরি সেই আসনের কাঠামোর ইস্পাত হয়তো যুক্তরাষ্ট্র থেকেই গিয়েছিল। এর কোনো ছোট যন্ত্রাংশ মেক্সিকোয় তৈরি হতে পারে। আবার ওহাইওতে সংযোজনের পর তৈরি আসনটি যে গাড়িতে বসানো হলো, সেই গাড়ির অন্য অনেক অংশ এসেছে তিন দেশের বিভিন্ন কারখানা থেকে। তাহলে গাড়িটি আসলে কোন দেশের?

আইনগতভাবে এর উত্তর দেওয়ার নিয়ম আছে। কিন্তু শিল্পের বাস্তবতায় উত্তর আমেরিকার একটি গাড়ি প্রায়ই বহু দেশের শ্রম, কাঁচামাল, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সম্মিলিত ফল। এ কারণেই শুল্কের প্রভাবও সীমান্তে থেমে থাকে না। একটি কানাডীয় যন্ত্রাংশের ওপর ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক প্রযোজ্য হলে প্রথম ধাক্কাটি পড়ে মার্কিন আমদানিকারকের ওপর। কিন্তু সেখান থেকে সেই ব্যয় ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো উৎপাদনব্যবস্থায়।

ধরা যাক, একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান বছরে এক কোটি ডলারের এমন কানাডীয় যন্ত্রাংশ আমদানি করে, যার পুরো মূল্য ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের আওতাভুক্ত। তাত্ত্বিকভাবে অতিরিক্ত শুল্ক দাঁড়াবে ৫০ লাখ ডলার। একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এ অঙ্ক শুধু শুল্ক বিভাগের সমস্যা নয়; এটি সরাসরি লাভ-ক্ষতি, পণ্যের মূল্য এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের প্রশ্ন।

অবশ্যই বাস্তবে শুল্ক নির্ধারণে আরও অনেক বিষয় বিবেচনা করতে হয়। পণ্যের সঠিক শুল্ক শ্রেণিবিন্যাস, উৎপত্তির দেশ, অধ্যায় ৯৯-এর সংশ্লিষ্ট বিধান এবং ২৩২ ধারা বা অন্য কোনো অতিরিক্ত শুল্ক প্রযোজ্য কি না—সবই পরীক্ষা করতে হয়। ফলে একই ধরনের দেখতে দুটি অটো যন্ত্রাংশের শুল্ক পরিস্থিতিও আলাদা হতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কে বহন করবে অতিরিক্ত খরচ? বাস্তবে সীমান্তে শুল্ক পরিশোধ করে আমদানিকারক। এরপর শুরু হয় অর্থনৈতিক বোঝা ভাগাভাগির জটিল প্রক্রিয়া।

কানাডীয় সরবরাহকারীকে হয়তো দাম কমাতে বলা হবে। মার্কিন আমদানিকারক কিছু খরচ নিজে বহন করতে পারে। গাড়ি নির্মাতা তার মুনাফার অংশ কমাতে পারে। আবার অতিরিক্ত খরচের কিছু অংশ শেষ পর্যন্ত ক্রেতার কাছেও যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, ৪০ হাজার ডলারের একটি গাড়িতে যদি দুই হাজার ডলারের এমন কানাডীয় যন্ত্রাংশ থাকে যার ওপর পুরো ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক প্রযোজ্য, তাহলে সরাসরি অতিরিক্ত শুল্কের অঙ্ক হবে এক হাজার ডলার। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে গাড়িটির বাজারমূল্য অবশ্যই এক হাজার ডলার বাড়বে। কে কতটা খরচ বহন করবে, বাজারে প্রতিযোগিতা কেমন, বিকল্প সরবরাহকারী পাওয়া যাচ্ছে কি না—এসবের ওপর চূড়ান্ত প্রভাব নির্ভর করবে। তাই ৫০ শতাংশ শুল্ক আর গাড়ির দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া এক কথা নয়, সরবরাহকারী বদলানোও সহজ নয়।

কেউ প্রশ্ন করতে পারেন—কানাডীয় যন্ত্রাংশে শুল্ক বেশি হলে মার্কিন কোম্পানি অন্য জায়গা থেকে কিনলেই তো হয়। অটোমোবাইল শিল্পে বিষয়টি এত সহজ নয়। একটি যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের অর্থ অনেক সময় শুধু নতুন বিক্রেতা খুঁজে পাওয়া নয়। নতুন উৎপাদন-সরঞ্জাম তৈরি, প্রকৌশলগত যাচাই, মান পরীক্ষা, পরীক্ষামূলক উৎপাদন এবং গাড়ি নির্মাতার অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত যন্ত্রাংশে এই প্রক্রিয়া আরও কঠোর। ফলে সরকার একটি শুল্ক এক দিনেই কার্যকর করতে পারলেও একটি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহব্যবস্থা এক দিনে বদলে ফেলা সম্ভব নয়। এ কারণেই শুল্কের তাৎক্ষণিক প্রভাব এবং পাঁচ বছর পরের প্রভাব এক নাও হতে পারে।

স্বল্পমেয়াদে অনেক প্রতিষ্ঠান হয়তো অতিরিক্ত খরচ মেনে নিয়েই বর্তমান সরবরাহব্যবস্থা চালিয়ে যাবে। কারণ নতুন সরবরাহকারী তৈরির ব্যয় ও ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে। কিন্তু শুল্ক যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন অন্য হিসাব শুরু হবে।

ধরা যাক, একটি কানাডীয় যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক তার উৎপাদনের অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করে। তখন তাকে হিসাব করতে হবে—কানাডায় উৎপাদন করে যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক দিয়ে পণ্য পাঠানো সাশ্রয়ী, নাকি যুক্তরাষ্ট্রেই নতুন উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করা সাশ্রয়ী? দীর্ঘ মেয়াদে দ্বিতীয়টি লাভজনক হয়ে উঠলে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিনিয়োগের প্রণোদনা তৈরি হতে পারে। এটাই সম্ভবত মার্কিন নীতির অন্যতম প্রত্যাশিত ফল—দেশের ভেতরে আরও উৎপাদন ও বিনিয়োগ আনা।

কিন্তু এরও একটি বড় বাধা আছে—অনিশ্চয়তা। একটি নতুন অটো কারখানা স্থাপনে বিপুল অর্থ লাগে। কোম্পানিকে বহু বছরের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আজকের শুল্ক যদি আগামী বছর উঠে যায়, তাহলে শুধু সেই শুল্ক এড়াতে নেওয়া কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ ভুল সিদ্ধান্ত হয়ে যেতে পারে। তাই শুল্কের হারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের কাছে আরেকটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ—নীতিটি কত দিন স্থায়ী হবে?

ওহাইও, মিশিগান ও অন্টারিওর দিকে তাকান। যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার অটো সম্পর্কের বাস্তব চিত্র দেখতে হলে গ্রেট লেকস অঞ্চল একটি চমৎকার উদাহরণ। মিশিগান ও ওহাইওর সঙ্গে কানাডার অন্টারিওর অটো শিল্প বহু বছর ধরে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে অসংখ্য ট্রাকে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ চলাচল করে।

কোনো কারখানা প্রথম স্তরের সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্য নিচ্ছে। সেই সরবরাহকারী আবার দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একটি নির্দিষ্ট যন্ত্রাংশের শুল্ক বাড়লে তার প্রভাব শুধু সেই পণ্যের আমদানিকারকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন খরচ, মজুত, চলতি মূলধন, উৎপাদন পরিকল্পনা এবং সরবরাহকারীদের সঙ্গে মূল্য আলোচনা—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে অটো শিল্পে প্রয়োজনের ঠিক সময়ে যন্ত্রাংশ সরবরাহের যে ব্যবস্থা বহু বছর ধরে উৎপাদন খরচ কমিয়ে রেখেছে, নতুন বাণিজ্য বাধা সেই ব্যবস্থাকেও চাপে ফেলতে পারে। কানাডাও বসে নেই, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের বিপরীতে কানাডাও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। ফলে বিরোধটি এখন আর শুধু মার্কিন শুল্কনীতির গল্প নয়।

পাল্টাপাল্টি শুল্কের একটি মৌলিক সমস্যা হলো—প্রতিপক্ষকে আঘাত করতে গিয়ে নিজের দেশের শিল্পকেও কখনো কখনো মূল্য দিতে হয়। কানাডা কোনো মার্কিন শিল্পপণ্যে শুল্ক বসালে সেটি ব্যবহারকারী কানাডীয় কারখানার কাঁচামালের খরচ বাড়তে পারে। একইভাবে কানাডীয় অটো যন্ত্রাংশে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক সেই যন্ত্রাংশ ব্যবহারকারী মার্কিন কারখানার খরচও বাড়াতে পারে। এটাই দুই দেশের গভীর অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতার এক ধরনের বৈপরীত্য।

এক পক্ষের রপ্তানি অনেক সময় অন্য পক্ষের উৎপাদনের কাঁচামাল। শুল্ক বিভাগের টেবিল থেকে পরিচালনা পর্ষদের টেবিলে।রবর্তমান শুল্ক পরিস্থিতি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনছে। একসময় আমদানি-রপ্তানি বা শুল্ক বিভাগের কাজকে অনেক প্রতিষ্ঠান মূলত কাগজপত্র, শ্রেণিবিন্যাস এবং সীমান্তে পণ্য ছাড়ের বিষয় হিসেবে দেখত।
এখন সেই বিভাগের একটি সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। একটি অটো যন্ত্রাংশ আমদানির আগে এখন জানতে হচ্ছে—পণ্যটির সঠিক শুল্ক শ্রেণিবিন্যাস কী? উৎপত্তির দেশ কোনটি? ইউএসএমসিএর সুবিধা পাওয়া যাবে কি? ৩৩৮ ধারা প্রযোজ্য কি? ২৩২ ধারার কোনো শুল্ক আছে কি? অধ্যায় ৯৯-এর কোন বিধান ব্যবহার করতে হবে? শুল্ক ফেরতের কোনো সুযোগ আছে কি? বিদেশি-বাণিজ্য অঞ্চল ব্যবহার করলে কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে কি?

এ প্রশ্নগুলোর কোনো একটির ভুল উত্তরও বড় আমদানিকারকের জন্য লাখ লাখ ডলারের বিপর্যয় আনতে পারে। ফলে শুল্ক ও বাণিজ্যবিধি মেনে চলার কাজ এখন শুধু আইন মেনে চলার বিষয় নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের পণ্য সংগ্রহ, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও আর্থিক কৌশলেরও অংশ।

এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি-বাণিজ্য অঞ্চল বা এফটিজেড ব্যবস্থাও নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিদেশি-বাণিজ্য অঞ্চলে পণ্য এনে শুল্ক পরিশোধ পিছিয়ে দেওয়া, মজুত ও আমদানি প্রক্রিয়ায় সুবিধা নেওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক ব্যয় সাশ্রয়ের সুযোগ থাকতে পারে।

তবে বিদেশি-বাণিজ্য অঞ্চলকে সব ধরনের অতিরিক্ত শুল্ক এড়ানোর উপায় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কোন পণ্য কী অবস্থায় অঞ্চলে প্রবেশ করছে, পরে মার্কিন বাজারে প্রবেশের সময় কোন শুল্ক প্রযোজ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষ শুল্কব্যবস্থার নিয়ম কী—এসব আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হয়। তবু উচ্চ শুল্কের পরিবেশে প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি-বাণিজ্য অঞ্চল, শুল্ক-স্থগিত গুদাম এবং রপ্তানির বিপরীতে শুল্ক ফেরতের মতো ব্যবস্থা নতুন করে মূল্যায়ন করবে—এটাই স্বাভাবিক।

সবচেয়ে বড় খরচের নাম হয়তো অনিশ্চয়তা। শুল্কের অঙ্ক হিসাব করা যায়। ১০ শতাংশ, ২৫ শতাংশ কিংবা ৫০ শতাংশ—ক্যালকুলেটরে বসিয়ে তার আর্থিক প্রভাব বের করা সম্ভব। কিন্তু অনিশ্চয়তার দাম হিসাব করা অনেক কঠিন। একটি কোম্পানি নতুন কারখানা কোথায় করবে?
নতুন উৎপাদন-সরঞ্জাম কানাডায় বসাবে, না যুক্তরাষ্ট্রে? পাঁচ বছরের সরবরাহ চুক্তি করবে কার সঙ্গে? নতুন কর্মী নিয়োগ করবে কোথায়?

এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার সময় শুধু আজকের শুল্কহার নয়, আগামী পাঁচ বা দশ বছরে বাণিজ্যনীতি কোন পথে যাবে, সেই ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই দীর্ঘস্থায়ী নীতিগত অনিশ্চয়তা নিজেই বিনিয়োগের জন্য একটি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। অটো শিল্পের মানচিত্র কি তবে নতুন করে আঁকা হবে? এ প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়।

শুল্ক দ্রুত প্রত্যাহার হলে অনেক প্রতিষ্ঠান হয়তো বর্তমান সরবরাহব্যবস্থাই ধরে রাখবে। কারণ কয়েক দশকে গড়ে ওঠা উৎপাদনব্যবস্থা ভেঙে নতুন করে তৈরি করা ব্যয়বহুল। অন্যদিকে উচ্চ শুল্ক যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ধীরে ধীরে পরিবর্তন শুরু হতে পারে। কিছু কানাডীয় প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়াতে পারে। কেউ নতুন বাজার খুঁজতে পারে। মার্কিন কোম্পানিও স্থানীয় সরবরাহকারী বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান মেক্সিকো বা অন্য অঞ্চলের দিকে তাকাতে পারে।

একটি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে শিল্পের মানচিত্র বদলায় না। কিন্তু হাজার হাজার সরবরাহকারী ও উৎপাদক যখন একই সময়ে নিজেদের খরচ, ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নতুন করে হিসাব করে, তখন তাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তই একসময় শিল্পের ভূগোল বদলে দিতে পারে। আর তাই যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার বর্তমান বিরোধকে শুধু একটি শুল্ক বিরোধ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা পুরোপুরি বোঝা যাবে না।

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভবিষ্যতের কারখানা কোথায় হবে, কর্মসংস্থান কোথায় সৃষ্টি হবে, কোন অঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ আসবে, কোন সরবরাহকারী টিকে থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত একটি গাড়ি তৈরির যন্ত্রাংশ কোন দেশের কারখানা থেকে আসবে—এসব প্রশ্নও। উত্তর আমেরিকার অটো শিল্প বহু দশক ধরে সীমান্তকে অতিক্রম করে একটি সমন্বিত উৎপাদনব্যবস্থা তৈরি করেছে। এখন সেই সীমান্তেই নতুন করে বসছে শুল্কের দেয়াল।

দেখার বিষয়, এই দেয়াল শুধু সীমান্তে পণ্যের চলাচলকে ব্যয়বহুল করে তোলে, নাকি একসময় কারখানা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতিপথও বদলে দিয়ে উত্তর আমেরিকার অটো শিল্পের মানচিত্র নতুন করে আঁকে।

লেখক: অটোমোবাইল সাপ্লাই চেন বিশেষজ্ঞ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র