বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট বা অভিবাসী ভিসা প্রদান প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে যে কঠোর অভিবাসনবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে, এই স্থগিতাদেশ তারই অংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত নভেম্বরে হোয়াইট হাউজের কাছে এক আফগান নাগরিকের গুলিতে ন্যাশনাল গার্ডের এক সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনার পর ট্রাম্প ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশ’ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন স্থায়ীভাবে বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছিলেন।প্রভাবশালী মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজ জানিয়েছে, ৭৫ দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসার স্থগিতাদেশ ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে। ফক্স নিউজ দাবি করেছে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি মেমো তাদের হাতে এসেছে। ওই মেমোতে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের বিদ্যমান আইনের আওতায় অভিবাসী ভিসা প্রত্যাখ্যান করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যতক্ষণ না ভিসা স্ক্রিনিং ও যাচাই পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন শেষ হয়। যেসব দেশ এ সিদ্ধান্তের আওতায় পড়েছে বাংলাদেশ ছাড়াও তার মধ্যে রয়েছে সোমালিয়া, রাশিয়া, আফগানিস্তান, ব্রাজিল, ইরান, ইরাক, মিসর, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, ইয়েমেন প্রভৃতি।
এ বিষয়ে বক্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ফক্স নিউজ তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে যেসব সম্ভাব্য অভিবাসী এসে সরকারি ভাতা ও কল্যাণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারে, তাদের অযোগ্য ঘোষণা করার ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের আছে এবং আমরা তা প্রয়োগ করব।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমেরিকান জনগণের উদারতার অপব্যবহার ঠেকাতে এই ৭৫ দেশের অভিবাসন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হচ্ছে, যতক্ষণ না ভিসা প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন শেষ হয়।’
সিএনএন জানিয়েছে, এ স্থগিতাদেশ নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, অর্থাৎ শিক্ষার্থী ও পর্যটক ভিসার মতো ক্যাটাগরিগুলো এর বাইরে থাকবে। ফলে যারা এ গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ দেখতে যেতে চান, তাদের জন্য এ সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হবে না।
এদিকে নতুন এ ঘোষণা নিয়ে এক্স হ্যান্ডেলে দেয়া এক পোস্টে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপর অগ্রহণযোগ্য হারে অনেক দেশের অভিবাসী নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এমন ৭৫টি দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করা হবে।
নতুন অভিবাসীরা যেন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের সম্পদ থেকে অন্যায্যভাবে সুবিধা নিতে না পারে—এটি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে। এ সিদ্ধান্তের আওতায় সোমালিয়া, হাইতি, ইরান ও ইরিত্রিয়াসহ ডজনখানেক দেশ পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের উদারতা যাতে আর অপব্যবহার না হয়, সে লক্ষ্যে প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে পোস্টে আরো বলা হয়। পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন সর্বদা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে অগ্রাধিকার দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমে বলেন, ‘আসলে বিদেশীরা যেন যুক্তরাষ্ট্রে না যায়—এটাই ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে। এখানে বার্তাটা পরিষ্কার, বাইরের পৃথিবীর মানুষের আসার দরকার নেই। ট্রাম্প প্রশাসন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বলে যে নীতি দিয়ে নির্বাচনে জিতেছে, এখন আমরা সেটারই বাস্তবায়ন দেখতে পাচ্ছি। ট্রাম্প দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বিন্যাস নতুনভাবে সাজাচ্ছেন। এটি তার অন্যতম বড় পদক্ষেপ।’
তিনি জানান, মার্কিন ইতিহাসে তাকালে দেখা যায়, তারা কখনো কখনো আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সক্রিয় হয়, আবার কখনো কখনো ‘আইসোলেশন’-এর পথে হাঁটে বা ঘরে ফিরে যায়। এটা বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক সংকেত বলেও জানান তিনি। হুমায়ুন কবির আরো বলেন, ‘এ নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে গমনেচ্ছুরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দুই দেশের মানুষে-মানুষে সম্পর্ক সীমিত হয়ে আসবে। ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কসহ অন্যান্য সম্পর্কের মাত্রাও সংকুচিত হবে। এগুলো আমাদের জন্য বেশ কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র একক দেশ হিসেবে বড় বাজার।’
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষায় শুরু থেকেই অভিবাসন কূটনীতিতে সক্রিয় ও কার্যকরভাবে যুক্ত হওয়া জরুরি। এ জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। বিশ্লেষকদের দাবি, বিষয়টি নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অভিবাসন কূটনীতিতে কাঙ্ক্ষিত কার্যকারিতার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সর্বশেষ যে ৭৫ দেশের ওপর অভিবাসন ভিসায় স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে সেগুলো হলো আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহামাস, বাংলাদেশ, বার্বাডোজ, বেলারুশ, বেলিজ, ভুটান, বসনিয়া, ব্রাজিল, বার্মা, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, কলম্বিয়া, আইভরি কোস্ট, কিউবা, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ডোমিনিকা, মিসর, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, ফিজি, গাম্বিয়া, জর্জিয়া, ঘানা, গ্রেনাডা, গুয়াতেমালা, গিনি, হাইতি, ইরান, ইরাক, জ্যামাইকা, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, কুয়েত, কিরগিজস্তান, লাওস, লেবানন, লাইবেরিয়া, লিবিয়া, মেসিডোনিয়া, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনেগ্রো, মরক্কো, নেপাল, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, রিপাবলিক অব কঙ্গো, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডিনস, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, টোগো, তিউনিসিয়া, উগান্ডা, উরুগুয়ে, উজবেকিস্তান ও ইয়েমেন।





