– 

– 

দ্য কোয়ায়েট উইদিন: আলো যেখানে গলে পড়ে, কথা বলে নীরবতা!

একটি সরু কাঠের সাঁকো নিস্তরঙ্গ জলের মধ্যে ভাসছে। দুপাশে খুঁটি রয়েছে। আকাশে মেঘ আছে কিন্তু সূর্য আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেই আলো জলের উপর পড়ছে এবং চারপাশে ধূসর আর সোনালি রং তৈরি হচ্ছে। সাঁকো, জল আর দূরের দিগন্ত সব একসাথে মিলে যাচ্ছে। এটি কোনো নিশ্চিত গন্তব্য নয়, নীরবতার মধ্যে কোথাও হারিয়ে যাওয়ার একটি দীর্ঘ পথ।

ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ের দোতলায় অবস্থিত কামরুল হাসান গ্যালারিতে ঢুকলে এমন দৃশ্য চোখে পড়লে সত্যিই খুব অন্যরকম লাগে। গ্যালারির বাইরে ঢাকার সেই চিরচেনা ব্যস্ততা; মানুষের ভিড়, যানজট, শব্দ আর আলো আর সব মিলিয়ে এক অস্থিরতা। কিন্তু গ্যালারির ভেতরে ঢুকলেই মনে হয় সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। গ্যালারির ভেতরে সবকিছু খুব ধীরগতির মনে হয়। সেখানে মানুষের চোখ কোনো একটি ছবির ফ্রেমের ওপর আটকে যায়। গ্যালারির ভেতরে আসা দর্শকও কয়েক মুহূর্তের জন্য সেখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

bKash

সেই থেমে যাওয়ার জায়গাটির নাম ‘দ্য কোয়ায়েট উইদিন’

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে গত ১৩ আগস্ট শুরু হয়েছে সিনেমাটোগ্রাফার রাশেদ জামানের প্রথম একক প্রদর্শনী। পাঁচ বছর ধরে ধারণ করা ছবি, আলো, প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা ও নিজের ভেতরের কথোপকথন; সব মিলিয়ে এই প্রদর্শনী যেন শিল্পীর নিজের কাছে ফিরে যাওয়ার এক অন্তর্লীন যাত্রার দৃশ্যমান রূপ। এমনই বার্তা জানান দিচ্ছে গ্যালারীতে থাকা প্রতিটি প্রদর্শনী।

আলোকচিত্র, নাকি চিত্রকর্ম

গ্যালারিতে প্রদর্শিত কাজগুলোর সামনে দাঁড়ালে একজন দর্শনার্থীর মনে যে দ্বিধা আসে, তা হলো এই কাজগুলো আসলে আলোকচিত্র, নাকি চিত্রকর্ম? কারণ ছবি ক্যামেরায় ধারণ করা হলেও, সেই ধাপেই কাজ থমকে থাকেনি। ক্যানভাসে ছবি প্রিন্ট করে, রাশেদ জামান রঙতুলি দিয়ে আঁচড় দিয়েছেন। কোথাও ড্রাই ব্রাশ ব্যবহার করেছেন, কোথাও টেক্সচার বের করে এনেছেন, কোথাও স্যাচুরেশন কমিয়েছেন। এরপর স্প্রে করে ফিনিশিং দিয়েছেন। ফলে ক্যামেরায় ধরা বাস্তব দৃশ্য ধীরে ধীরে অন্য বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। আলোকচিত্র আর পেইন্টিংয়ের মাঝে জায়গায় দাঁড়িয়ে, কাজগুলোর যেন এক নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়েছে।

গ্যালারির আরেকটি ফ্রেমে দেখা গেছে, সূর্যের আলোয় ভেসে থাকা বড় জায়গা। কোথাও মেঠোপথ, কোথাও গরুর পাল। আরেকটি ছবিতে জল আর প্রকৃতির ছবি দেখা যাচ্ছে। কোথাও গাছের পাতা, আকাশ আর দিগন্তরেখা ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। যেন সব রেখা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। কোথায় আকাশ শেষ হয়েছে, কোথা থেকে শুরু হয়েছে মাটি বা জল, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। এই অস্পষ্টতা ছবিগুলোকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। বাস্তব দৃশ্য ধীরে ধীরে বিমূর্ত হয়ে যাচ্ছে। আলো আর আঁধারের মধ্যে বাস্তবতা পরাবাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। যেখানে আলো কেবল দেখা যাওয়ার জন্য নয় বরং আলো নিজেই ছবির ভাষা হয়ে উঠেছে।

আলো থেকে শুরু, নীরবতায় এসে থামা

রাশেদ জামানের আলোর প্রতি এই আকর্ষণের শুরু অবশ্য অনেক আগে। তাঁর শৈশবে। ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা রাশেদের নানা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। গোসল করে গায়ে আতর মেখে পূর্বদিকের জানালার পাশে খালি গায়ে চেয়ার পেতে লেখালেখি করতেন। জানালা দিয়ে আসা সকালের আলো তাঁর শরীরে পড়ত। সেই আতরের ঘ্রাণ আর চোখে-মুখে আলোর স্পর্শে ঘুম ভাঙত ছোট্ট রাশেদের। একটি শিশুর চোখে দেখা সেই সকালের দৃশ্য হয়তো তখন নিছকই একটি সাধারণ দৃশ্য ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেটিই হয়ে উঠেছে আলোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের এক গভীর স্মৃতি-বন্ধন।

ছোটবেলায় ইচ্ছা ছিল পেইন্টার হওয়ার। আবদুর রাজ্জাকের একটি পেইন্টিং দেখে তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, মেঘের ফাঁক দিয়ে রোদ কীভাবে আসে! সেখান থেকেই আলো নিয়ে তাঁর এক ধরনের বিস্ময়-আবেগ তৈরি হয়। তখন তিনি জানতেন না আলোর এই ব্যবহারকে কীভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়। শুধু অনুভব করতেন, আলো বদলে দিলে একটি জায়গার অনুভূতিও বদলে যায়। শেষেমেশ স্বপ্নের সেই পেইন্টার শেষ পর্যন্ত হওয়া হয়নি। সময়ের পরিক্রমায় রাশেদ জামান হয়ে উঠেছেন সিনেমাটোগ্রাফার। কিন্তু পেইন্টিংয়ের আকাঙ্ক্ষা তাঁর ভেতরে থেকে গেছে। তাই তুলি ও রঙের পরিবর্তে জায়গা নিয়েছে ক্যামেরা ও লেন্স।

রাশেদ জামান বলেন, ‘আমি তুলি চালাতে, রঙ ব্যবহার করতে জানি না। কিন্তু ক্যামেরা ও লেন্স বুঝি। তাই আমার ক্যামেরা আর লেন্সই তুলি ও রঙের জায়গাটা নিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টা পেইন্টার হওয়া বা না হওয়া নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো আমি আবেগ প্রকাশ করতে চাই। ভেতরে যা আছে তা প্রকাশ করতে চাই।’ ‘দ্য কোয়ায়েট উইদিন’ যেন সেই ভেতরের কথাগুলোই প্রকাশের একটি মাধ্যম।

নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন

শহুরে জীবনে মানুষ ক্রমাগত মানুষের মধ্যেই থাকে। কথা বলে, কাজ করে, হরদম ছুটে চলে। কিন্তু সেই ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনের জায়গাটি অনেক সময় হারিয়ে যায়। রাশেদ জামানের ক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছিল। নানা কাজের ব্যস্ততা, ভিড় এবং শহুরে কোলাহলে তাঁর জীবন থেকে ‘নির্জনতা’, একাগ্রতা ও মৌনতার মতো ব্যাপারগুলো হারিয়ে গিয়েছিল। হাজারো মানুষের সঙ্গে বছরের পর বছর কথা বলেছেন তিনি। অথচ নিজের সঙ্গে বসে নিজের যে কথোপকথন, সেটি আর হয়ে ওঠেনি। সেখান থেকেই শুরু এই যাত্রা।

এজন্যই তাঁর ছবিতে প্রকৃতি আছে, কিন্তু প্রকৃতি থেকে বড় হয়ে ওঠে নির্জনতা। আলো আছে কিন্তু আলোতে মিশে থাকে আত্মমগ্নতা। বিস্তীর্ণ প্রান্তর আছে, তবে মানুষের উপস্থিতি খুব কম। একটি ছবিতে খোলা জায়গায় একটি গাছ দাঁড়িয়ে আছে। আরেকটি ছবিতে বিস্তীর্ণ জায়গায় একজন মানুষ আছে। পুরো প্রদর্শনীতে মানুষের উপস্থিতি খুব কম। ফলে সেই একাকী মানুষটি নিয়ে অন্য একটি অর্থ তৈরি হয়। সে কি মাত্র ছবির চরিত্র? নাকি শিল্পীর নিজের কোনো অংশ? শিল্পী সরাসরি উত্তর দেননি। কিন্তু তাঁর বক্তব্য থেকে মনে হয় যে, ছবির এই একাকীত্বের সঙ্গে তাঁর নিজের জীবনের কিছু যোগ আছে।

পাঁচ বছরের দেখা, আড়াই বছরের নির্মাণ

দ্য কোয়ায়েট উইদিন এর কাজগুলো একদিনে তৈরি হয়নি। রাশেদ জামান পাঁচ বছর ধরে ছবি তুলেছেন। তোলা ছবির পরও কাজ শেষ হয়নি। একটি ছবি প্রিন্ট করেছেন। সেটি দেখেছেন। যদি পরিবর্তন দরকার মনে হয় আবার কাজ করেছেন। আবার প্রিন্ট করেছেন। এভাবে প্রায় আড়াই বছর চলেছে। বসুন্ধরা থেকে ধানমন্ডি পর্যন্ত নিয়মিত যাতায়াত করেছেন। ছবি প্রিন্ট করিয়েছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। পছন্দ না হলে নতুন করে শুরু করেছেন।

প্রদর্শনীর সময়ও রাশেদ জামানের কাজ থামেনি। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাশেদ জামান একটি ছবি নতুন করে প্রিন্ট করাচ্ছিলেন। প্রিন্ট করার পর ছবি ময়েশ্চারাইজড করেছেন। তার ওপর ড্রাই ব্রাশ চালিয়েছেন। কিছু জায়গায় টেক্সচার বের করেছেন। অন্য জায়গায় স্যাচুরেশন কমিয়েছেন। এরপর স্প্রে করে ফিনিশিং করেছেন। ছবির কাঙ্ক্ষিত রূপ না পাওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলেছে। ফলে প্রতিটি কাজের পেছনে শুধু একটি মুহূর্ত ধারণের গল্প নেই। বরং দীর্ঘ সময় ধরে সেই মুহূর্তকে বোঝার এবং নিজের মতো করে প্রকাশ করার একান্ত চেষ্টা আছে।

ছবির ভেতর ‘স্পেস’

শিল্পচর্চায় ‘স্পেস’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাশেদ জামানের কাজগুলোতে সেই স্পেস আলাদা করে অনুভব করা যায়। স্পেস কেবল কংক্রিট বস্তু দিয়ে গড়ে ওঠে না। ফ্রেম দিয়েও স্পেস গড়ে ওঠে। কখনো শুধু আলো দিয়েও দৃশ্যমান স্পেস তৈরি করা যায়। সেই স্পেস স্থিরতার ছাপ দিতে পারে, আবার গতিশীলতার ছাপও দিতে পারে। রাশেদ জামানের ছবিতে আলো স্পেস তৈরির সবচেয়ে বড় উপাদান। অধিকাংশ ছবি প্রায় একরঙা, অথবা খুব কাছাকাছি টোনের অল্প কয়েকটি রঙে গঠিত। উপাদানও কম রয়েছে। ফলে চোখে চাপ সৃষ্টি করে না ছবিগুলো। বরং ধীরে ধীরে দর্শককে ভেতরে টেনে নিয়ে যায়। সূর্য এখানে তীব্র নয়, বরং কোমল। আলো যেন জলের ওপর, প্রান্তরের ওপর, বা দূরবর্তী দৃশ্যের ওপর ধীরে ধীরে গলে পড়ে। কিছু ছবিতে গভীর ও স্বপ্নময় নীল প্রকৃতির ছোঁয়া মিশে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে আলো ও ছায়ার মিশেলে দৃশ্যটি এমন হয় যে বাস্তব আর কল্পনার সীমা অস্পষ্ট হয়ে যায়। একটি ফ্রেমে সামান্য কয়েকটি উপাদানে বিস্তীর্ণ মহাবিশ্বের অনুভূতি জন্মায়।

দর্শকও যেন যাত্রার অংশ

সাধারণত শিল্পপ্রদর্শনীতে দর্শক ছবির সামনে দাঁড়ান, দেখেন, হয়তো ছবি তোলেন, আবার এগিয়ে যান। কিন্তু ‘দ্য কোয়ায়েট উইদিন’-এর কাজগুলোর সামনে দাঁড়ালে গতি যেন একটু কমে আসে। একটি ছবির সামনে কয়েক মুহূর্ত থামতে হয়। তারপর আরেকটি। দৃশ্যের সঙ্গে চোখের সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর ধীরে ধীরে তার ভেতরের আবহটুকু অনুভব করা যায়। এক দর্শককে বাঁশি বাজাতে দেখে মনে হলো, তিনি আর এখানে নেই। হারিয়ে গিয়েছেন সেই প্রদর্শিত দৃশ্যের পথ ধরে। যেন নির্জন-নীরলায় বসে জীবনে অপ্রাকিৃত সুখগুলোর উপর হাত বুঁলাচ্ছেন।

হয়তো এটাই রাশেদ জামানের সবচেয়ে বড় সাফল্য। রাশেদ জামান দর্শককে শুধু ছবি দেখাতে চাননি বরং ছবির ভেতরের একটি অনুভূতির কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। নিজের ক্যামেরায় ধরা পড়া ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর মাঝে রাশেদ জামান বহুকাল পরে নিজের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। সেই ক্ষণস্থায়ী, অপার্থিব অনুভূতিগুলোকে রাশেদ জামান নিজের মতো করে ফ্রেমবন্দী করেছেন। এখন সেই ফ্রেমের সামনে দাঁড়িয়ে দর্শকও সেই অনুভূতির সামান্য ছোঁয়া পাচ্ছেন। রাজধানীর ব্যস্ত জীবনে যেখানে এক মুহূর্ত থেমে থাকা কঠিন, সেখানে এই প্রদর্শনী যেন সেই বিরতিরই একটি জায়গা। এখানে কোনো উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা নেই। নেই দৃশ্যের অতিরিক্ত আয়োজন। আছে আলো, কিছু রং, প্রকৃতির কয়েকটি অবয়ব, বিস্তীর্ণতা আর নীরবতা। আর সেই নীরবতার মধ্যেই হয়তো মানুষ নিজের ভেতরের শব্দগুলো শুনতে পায়।

রাশেদ জামানের ‘দ্য কোয়ায়েট উইদিন’ তাই কেবল একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী নয়। এটি এক সিনেমাটোগ্রাফারের ক্যামেরা দিয়ে নিজের ভেতরের অদৃশ্য ভূগোল খুঁজে দেখার গল্প। যেখানে আলো কখনো স্মৃতি, কখনো অনুভূতি; প্রকৃতি কখনো দৃশ্য, কখনো আত্মপ্রতিকৃতি; আর নীরবতা হয়ে ওঠে নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনের ভাষা।

প্রদর্শনীটি চলবে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান গ্যালারিতে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।