কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আর নেই। আজ সকাল ৯টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নইলাহি রাজিউন)। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের একটি পারিবারিক সূত্র ট্রেড ট্রিবিউনকে মৃত্যুর এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিন দশকেরও বেশি সময় সক্রিয় থাকা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে টানা সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে দক্ষ সংগঠক ও অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য হিসেবে তার আলাদা পরিচিতি ছিল। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে তার ছেলে মাহবুব রহমান রুহেল একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
দীর্ঘদিন কারাভোগের পর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের (কেরানীগঞ্জ) জেলার একেএম মাসুম জানিয়েছিলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন মামলায় ধাপে ধাপে জামিন পাওয়ার পর সর্বশেষ পল্টন থানার একটি মামলায় জামিন নিশ্চিত হলে নিয়ম অনুযায়ী সব কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং পাহারায় থাকা কারারক্ষী প্রত্যাহার করা হয়।
জানা যায়, গত ৫ আগস্ট গভীর রাতে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় গুরুতর শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে কারাগারের হাসপাতাল থেকে তাকে দ্রুত বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে সিসিইউ থেকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয় এবং এক পর্যায়ে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এর আগে কারাগারে থাকা স্বামীর জন্য দ্রুত জামিন ও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ চেয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে লিখিত আবেদন করেন স্ত্রী আয়েশা সুলতানা আবেদনে তিনি অভিযোগ করেন, চিকিৎসায় অবহেলা ও অযত্নের কারণে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তিনি নিউমোনিয়া, হৃদরোগ, কিডনি জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর রাতে রাজধানীর ভাটারা থানাধীন এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর পল্টন থানার একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের একাধিক মামলায় আদালতে হাজির করার সময় তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে ১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি ও আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল ও স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজে পড়াশোনা শেষে ১৯৬৬ সালে লাহোরের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছয় দফা আন্দোলনের সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে এম এ আজিজের হাত ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। যুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে শুভপুর সেতু ধ্বংস অভিযানে নেতৃত্ব দেন এবং পরে বিভিন্ন গেরিলা অভিযানে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। ১৯৭০ সালে প্রথমবার প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ছয়বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় হুইপের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ছাড়াও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
রাজনীতির বাইরে ব্যবসায়িক অঙ্গনেও সক্রিয় ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ১৯৮৩ সালে ‘গ্যাসমিন লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এছাড়া চট্টগ্রামের অভিজাত ‘দ্য পেনিনসুলা চিটাগাং’ হোটেলের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বহুবার হামলা ও নির্যাতনের শিকার হন এই প্রবীণ রাজনীতিক। ১৯৮০ সালে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় হামলায় তার পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালে শেখ হাসিনার মিছিলে পুলিশের গুলিতে আহত হন। পরে ১৯৯২ সালে ফটিকছড়িতে হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন তিনি।







