শুক্রবার – ৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার – ৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ১৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিপজ্জনক কেমিক্যালে ‘বারুদের স্তূপ’ চট্টগ্রাম বন্দর!

দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর এখন বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা বিপজ্জনক কেমিক্যাল, ধ্বংসযোগ্য রাসায়নিক পদার্থ এবং জরাজীর্ণ কনটেইনার সময়মতো অপসারণ না হওয়ায় বন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিলাম জটিলতা, আদালতে বিচারাধীন মামলা এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতায় এসব ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য বছরের পর বছর শেড ও ইয়ার্ডে পড়ে থাকায় যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ৪ নম্বর বার্থে একটি রাবার গ্যান্ট্রি ক্রেনে আগুন লাগার ঘটনাও সেই শঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। বন্দরের নিজস্ব ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর দ্রুত তৎপরতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও কয়েকটি কনটেইনার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় এক বছর ধরে ডেলিভারির অপেক্ষায় থাকা আমদানি করা ফ্রিজভর্তি একটি কনটেইনারও পুড়ে যায়।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো গেলেও বন্দরের বিভিন্ন শেড ও ইয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা বিপজ্জনক কেমিক্যাল এবং ধ্বংসযোগ্য কনটেইনার ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার অ্যান্ড মেরিন) কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ বলেন, দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় অনেক কনটেইনারে লিকেজ সৃষ্টি হয়। এতে ভেতরে থাকা রাসায়নিক পদার্থের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এজন্য এসব কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।

বন্দর কর্তৃপক্ষ কাস্টম কমিশনারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছে, বর্তমানে শুধু পি-শেডেই ৩০২ প্যাকেজ বিপজ্জনক কেমিক্যাল ও রাসায়নিক পণ্য রয়েছে। এছাড়া নিলাম কিংবা ধ্বংসের অপেক্ষায় আরও ১২২ প্যাকেজ কেমিক্যাল দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে।

এছাড়া বিভিন্ন ইয়ার্ডে ধ্বংসযোগ্য ৩৩১ টিইইউএস বিপজ্জনক পণ্যবোঝাই কনটেইনারের মধ্যে ৪২টি ইতোমধ্যে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে ঘোষণাপত্রে সাধারণ টেক্সটাইল কেমিক্যাল উল্লেখ করা হলেও পরে দেখা যায় সেখানে বিস্ফোরক বা উচ্চঝুঁকির রাসায়নিক রয়েছে। এতে নিলাম ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে পড়ে।

চট্টগ্রাম কাস্টম বিডার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. এয়াকুব চৌধুরী বলেন, অনেক আমদানিকারক ঘোষণাপত্রে এক ধরনের পণ্যের তথ্য দিলেও ইনভেন্টরির সময় ভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক কেমিক্যাল পাওয়া যায়। এ ধরনের মিথ্যা ঘোষণা পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে।

কাস্টমস সূত্র জানায়, উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলা ও অন্যান্য আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন এসব কেমিক্যাল নিলাম বা ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। তবে সম্প্রতি বিপজ্জনক কেমিক্যাল ধ্বংসে তৃতীয় পক্ষের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন বলেন, মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হয়েছে। এখন হোলসিমের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর ধাপে ধাপে কেমিক্যাল ধ্বংসের কার্যক্রম শুরু করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রতিবছর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কয়েক লাখ কোটি টাকার আমদানি-রফতানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়। এই বাণিজ্য থেকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ বছরে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে। ফলে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই অবকাঠামোকে ঝুঁকিমুক্ত রাখা শুধু নিরাপত্তার নয়, জাতীয় অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।