মঙ্গলবার – ১১ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ২৭শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মঙ্গলবার – ১১ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ২৭শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বনের কেওড়া যেভাবে নারীর মনে স্বপ্ন বুনছে!

সুন্দরবনসহ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জন্মানো কেওড়া গাছের ফল সাধারণত স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত একটি মৌসুমি টক ফল হিসেবে। কিন্তু সেই ফলই এখন হয়ে উঠছে উপকূলীয় নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণের নতুন হাতিয়ার।

সম্প্রতি এমনই এক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (AUW) গ্রিন বাংলা প্রজেক্ট। স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা কেওড়া বা ম্যানগ্রোভ অ্যাপল দিয়ে আচার, টকজাতীয় খাবার ও সংরক্ষিত খাদ্যপণ্য তৈরি, বাজারজাত ও বিক্রির মাধ্যমে প্রত্যন্ত উপকূলের নারী উৎপাদকদের শহরের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করছে এ প্রকল্পটি। এর মধ্য দিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং তরুণদের পরিবেশবান্ধব উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার একটি সমন্বিত মডেল তৈরি হচ্ছে।

বনের ফল, নারীর আয়ের পথ

উপকূলীয় লবণাক্ত পানি ও ম্যানগ্রোভ বেষ্টিত এলাকায় প্রচুর কেওড়া গাছ জন্মে। স্থানীয়ভাবে কেওড়া নামে পরিচিত এ  গাছের ফল দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাবারে টক ও স্বাদ বাড়ানোর উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এ ফলের সম্ভাবনা শুধু খাবারের স্বাদে সীমাবদ্ধ নয়। তথ্য অনুযায়ী, কেওড়া ফলে রয়েছে বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান, ভিটামিন সি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ পলিফেনল ও ফ্ল্যাভোনয়েড। যেমন: কোয়ারসেটিন ও ফেরুলিক অ্যাসিড। এসব উপাদানের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও ব্যথানাশক বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

এছাড়া কিছু ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে কেওড়ার সম্ভাব্য ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আর এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় নারীরা বনে পাওয়া কেওড়া দিয়ে তৈরি করছেন আচার, টকজাতীয় খাবার ও সংরক্ষিত খাদ্যপণ্য। ফলে মৌসুমি একটি বুনো ফল এখন তাঁদের জন্য বাড়তি আয়ের উৎস হয়ে উঠছে।

‘প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যশক্তির আধার’ কেওড়া

AUW-এর পরিবেশবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক ড. মোসায়ে সেলভাকুমার পলরাজ কেওড়ার পুষ্টিগুণ ও সম্ভাবনা সম্পর্কে বলেন, কেওড়া আচার ঐতিহ্যবাহী ম্যানগ্রোভ খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিক স্বাস্থ্যসচেতনতার একটি সংযোগ তৈরি করছে। তিনি জানান, সুন্দরবনের বন্য কেওড়া গাছ থেকে সংগ্রহ করা এই ফলে সাধারণ সাইট্রাসজাতীয় ফলের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভিটামিন সি রয়েছে।  অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি হজমে সহায়তা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত উপকারের সম্ভাবনাও রয়েছে।

নারীর হাতে অর্থনীতি, বনেরও সুরক্ষা

গ্রিন বাংলা প্রজেক্টের  অন্যতম ভিত্তি ইকোফেমিনিজম—যেখানে নারীর সমতা, মানুষের কল্যাণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে একই সূত্রে দেখা হয়। উপকূলীয় নারীরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। তবে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংরক্ষণে তাঁদের রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। প্রকল্পটি এসব নারীর হাতে কেওড়া প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি করছে। এতে তাঁরা সরাসরি আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন, বাড়ছে তাঁদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ। কেওড়া গাছ সুস্থ থাকলে প্রতিবছর বেশি ফল পাওয়া যায়। ফলে গাছ ও ম্যানগ্রোভ বন টিকে থাকা নারীদের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ বন কাটা নয় বরং বন অক্ষত রাখাই হয়ে উঠছে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি আয়ের জন্য লাভজনক।

শিক্ষার্থীরাও হচ্ছেন ‘ইকোপ্রেনার’

শুধু উপকূলের নারী উৎপাদকদের মধ্যেই প্রকল্পটির কার্যক্রম সীমাবদ্ধ নয়। AUW-এর শিক্ষার্থীরাও এতে যুক্ত হয়েছেন। পণ্যের ব্র্যান্ডিং, প্যাকেজিং, বাজার খোঁজা, প্রচারণা এবং সরাসরি বিক্রিতে শিক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। ফলে শ্রেণিকক্ষের বাইরেই তাঁরা হাতে-কলমে ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। একই সঙ্গে তাঁরা শিখছেন পরিবেশবান্ধব বিপণন, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক ব্যবসার ধারণা। ক্রেতাদের কাছেও কেওড়ার সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ এবং উপকূলীয় পরিবেশ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছেন তাঁরা। এভাবেই প্রকল্পটি তরুণদের মধ্যে তৈরি করছে ইকোপ্রেনারশিপ বা পরিবেশবান্ধব উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা।

মৌসুমি ফল, টেকসই উদ্যোগ

গ্রিন বাংলা প্রজেক্ট কেওড়ার স্বাভাবিক মৌসুমকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। সারা বছর উৎপাদনের জন্য প্রকৃতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে মৌসুমি ফলের স্বাভাবিক চক্রকে সম্মান করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ কেওড়া উৎপাদনের মৌসুমে সংগ্রহ করা হবে, স্থানীয় নারীরা তা প্রক্রিয়াজাত করবেন, শিক্ষার্থীরা বাজারজাতকরণে যুক্ত হবেন এবং শহরের সচেতন ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে যাবে সেই পণ্য।

একটি কেওড়া আচারের বয়ামের মধ্যেই তাই যেন তৈরি হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ চক্র; ম্যানগ্রোভ বন থেকে ফল সংগ্রহ, নারীর হাতে প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বাজারজাতকরণ এবং সচেতন ভোক্তার হাতে পৌঁছানো।

স্বাদে মুগ্ধ আন্তর্জাতিক অতিথিও

এই উদ্যোগের তৈরি কেওড়া আচার সম্প্রতি স্বাদ গ্রহণ করেছেন ড. ন্যান্সি মক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তুলেন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক এবং গ্লোবাল হেলথ সিস্টেমস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের বিশেষজ্ঞ। কেওড়া আচার খেয়ে এর স্বাদ ও ঘ্রাণ তাঁর বেশ ভালো লেগেছে বলে জানান তিনি।

এক ফলেই তিন সম্ভাবনা

গ্রিন বাংলা প্রজেক্ট দেখিয়েছে, একটি সাধারণ মৌসুমি ফলও কীভাবে একই সঙ্গে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকল্পটির সমন্বয়ে রয়েছেন গ্রিন বাংলা প্রজেক্টের সহকারী প্রকল্প ব্যবস্থাপক শায়কা। ড. মোসায়ে সেলভাকুমার পলরাজের সঙ্গে সমন্বয় করে তিনি এ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।