বাড়ির আঙিনায় একটি ছোট্ট নার্সারি। সেখানে যত্নে বেড়ে উঠছে বীজ থেকে তৈরি চারা। সেই চারা বিক্রি করে মিলছে আয়। আবার মৌসুমি কেওড়া গাছ দিয়ে তৈরি হচ্ছে আচার, যা বিক্রি করে নিজেদের শ্রম ও দক্ষতাকে আয়ে রূপ দিচ্ছেন স্থানীয় নারীরা। সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালীতে পরিবেশ সংরক্ষণের এমন উদ্যোগই ধীরে ধীরে নারীদের জীবিকা, আত্মবিশ্বাস ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের নতুন পথ তৈরি করছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) গুলিয়াখালীর স্থানীয় নারী ঝর্ণা আক্তারের বাড়িতে আয়োজিত এক কমিউনিটি মতবিনিময়ে উঠে আসে নারীদের এই পরিবর্তনের গল্প। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (AUW) Green Bangle Movement (GBM) এ কমিউনিটি মতবিনিময়ের আয়োজন করে।
এতে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের টিউলেন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ড. ন্যান্সি মক, AUW-এর পরিবেশবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক ড. মোসায়ে সেলভাকুমার পলরাজ এবং GBM-এর সদস্যরা। সহযোগী অংশীদার হিসেবে ছিল YPSA।
স্থানীয় নারীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাঁদের জীবিকা, আত্মবিশ্বাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, নেতৃত্ব এবং দৈনন্দিন জীবনে পরিবেশভিত্তিক এসব উদ্যোগের প্রভাব বুঝানোই ছিল এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
আলোচনায় ড. ন্যান্সি মক স্থানীয় নারীদের তাঁদের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। জবাবে নারীরাও তুলে ধরেন, কীভাবে নিজেদের শ্রম, দক্ষতা ও স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে তাঁরা আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন এবং পরিবার ও কমিউনিটিতে তাঁদের ভূমিকা কীভাবে বদলাচ্ছে।

বীজ থেকে চারায়, চারায় আয়
গুলিয়াখালীর নারীদের জীবিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো এ বাড়িভিত্তিক নার্সারি। GBM-এর কাছ থেকে পাওয়া বীজ দিয়ে নারীরা নিজেদের বাড়িতে চারা উৎপাদন করছেন। তাঁদের যত্ন ও শ্রমে বেড়ে ওঠা এসব চারা পরবর্তী সময়ে বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কাজে ব্যবহারের জন্য কিনে নেওয়া হচ্ছে।
এদিনের সফরে ঝর্ণা আক্তারের বাড়ির নার্সারি পরিদর্শন করে দলটি। সেখানে বীজ থেকে বেড়ে ওঠা চারাগুলো দেখার পাশাপাশি স্থানীয় নারীদের নার্সারি থেকে চারাও কেনা হয়। কেওড়াতেও জীবিকার নতুন সম্ভাবনা নার্সারির পাশাপাশি মৌসুমি কেওড়া বা ম্যানগ্রোভ অ্যাপল দিয়ে আচার তৈরি ও বিক্রিও করছেন স্থানীয় নারীরা। AUW কমিউনিটির মধ্যে এসব আচার বিক্রির মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া সম্পদকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা আয় করছেন। ফলে পরিবেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত একটি স্থানীয় সম্পদই হয়ে উঠছে নারীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ।

বাড়ির উঠানেই সবুজের বিস্তার
এ কার্যক্রমে GBM-এর নার্সারি থেকে প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী স্থানীয় সব নারীকে মরিঙ্গা গাছের চারা উপহার দেওয়া হয়। নারীরা নিজেদের বাড়িতে এসব চারা রোপণ করেন। পাশাপাশি বাড়ির বাইরে রোপণ করতে দেওয়া হয় তাল ও খেজুরের চারাও। এতে একদিকে যেমন নারীদের নিজস্ব নার্সারি কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে তাঁদের বাড়ি ও আশপাশের এলাকাতেও বাড়ছে সবুজের পরিমাণ।
পরিবেশের রক্ষক, জীবিকার উদ্যোক্তা গুলিয়াখালীর এই উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো—পরিবেশ সংরক্ষণকে নারীর জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করা। নারীরা এখানে শুধু গাছ লাগাচ্ছেন না; তাঁরা চারা উৎপাদন করছেন, বিক্রি করছেন এবং নিজেদের শ্রমকে অর্থনৈতিক মূল্যে রূপ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে তৈরি করছেন কেওড়ার মতো মৌসুমি পণ্য। এর মধ্য দিয়ে নারীরা ধীরে ধীরে চারা উৎপাদক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও পরিবেশের রক্ষক হিসেবে নিজেদের ভূমিকা তৈরি করছেন।

GBM আয়োজিত এ কমিউনিটি মতবিনিময়ের GBM সহকারী প্রকল্প ব্যবস্থাপক শাইকা মোহাম্মদ চৌধুরী এবং AUW-এর পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও YPSA-এর যুব সমন্বয়ক আফরা নওয়ার রহমান কমিউনিটি আলোচনাটি সমন্বয় করেন। GBM ও YPSA-এর এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু নারীদের আয় করার সুযোগ তৈরি করা নয়; একই সঙ্গে নারীর ক্ষমতায়ন, জীবিকা উন্নয়ন, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় পরিবেশগত উদ্যোগে কমিউনিটির অংশগ্রহণ ও মালিকানা শক্তিশালী করা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুলিয়াখালীর নারীদের বাড়ির ছোট ছোট নার্সারি আর কেওড়ার আচার তাই কেবল জীবিকার গল্প নয়। একটি বীজ যেমন মাটিতে শিকড় গড়ে, তেমনি পরিবেশের যত্নে নারীর অংশগ্রহণও ধীরে ধীরে শিকড় গড়ছে অর্থনীতি, নেতৃত্ব ও আত্মনির্ভরতার মাটিতে।







