রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গানটির কথা মনে আছে? যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে। কেন যেন মনে হয়, শতবর্ষ আগে রবি ঠাকুর বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কথা ভেবেই এ গানটা লিখেছিলেন।
কিছুদিন আগে আমার কিছু বিদেশি ক্রেতা বাংলাদেশে এসেছিলেন। আমি তাদের নিয়ে একটি ক্লাবে বসেছিলাম। কিছুক্ষণ পরে আমি দেখতে পেলাম, আরেকজন ভদ্রলোক কয়েকজন বিদেশির সঙ্গে পাশের টেবিলে বসেছেন এবং তাদের বলছেন, ‘পরেরবার যখন আপনারা আসবেন, আমি আপনাদের অন্য জায়গায় নিয়ে যাব এবং ঘুরিয়ে দেখাব। ঐ জায়গা আরও সুন্দর।’ এক পর্যায়ে আমার মনে হলো, আমরা দুজন ব্যবসায়ী নই বরং ট্যুর গাইড! বিদেশি ক্রেতারা আসছেন, আর আমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের আতিথেয়তা, ভ্রমণ এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করছি। যেখানে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমার ফোকাস দেওয়া উচিত ছিল, ব্যবসার মূল চুক্তি বা নেগোসিয়েশনে সেখানে আমাকে লজিস্টিকস ও দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার মতো একদম প্রাথমিক কাজও করতে হচ্ছে।
সাধারণত, আমার বিদেশি ক্রেতারা যখন ঢাকার বিমানবন্দরে আসেন, আমি সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সুন্দরভাবে স্বাগত জানাই। পরিচিতদের মাধ্যমে তাদের অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করি। চট্টগ্রামে আসার পরও আমার বন্ধু ও পরিচিত মহলের সহযোগিতায় তাদের জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করি। আমি তাদেরকে বিভিন্ন ক্লাব, সামাজিক স্থান এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশে নিয়ে যাই, যাতে তারা বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি ভালো ধারণা নিয়ে ফিরে যেতে পারেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, যাদের এই ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা সুযোগ নেই, তারা কীভাবে করবেন? একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী বা ক্রেতা যখন বাংলাদেশে আসেন, তাকে স্বাগত জানানো, সহযোগিতা করা, দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু এগুলো কী শুধু একজন ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত দায়িত্ব হওয়া উচিত? নাকি এটি রাষ্ট্রেরও একটি দায়িত্ব?
আমাদের দেশের সফল ব্যবসায়ীদের জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রত্যেকেই নিজস্ব যোগ্যতা, পরিশ্রম, সাহস এবং নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। বেশিভাগই তাদের পাশে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ছিল না বরং নিজেরাই পথ তৈরি করে এগিয়ে গেছেন। ব্যবসায়ীদের এ লড়াই প্রশংসনীয় হলেও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া একজন ব্যবসায়ী একা একা ঠিক কতদূরই বা এগোতে পারবেন, সেই প্রশ্নটিই এড়িয়ে যাচ্ছেন এ খাতের নীতিনির্ধারকরা। ব্যবসায়ীদের যেখানে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘লজিস্টিক সাপোর্ট’ পাওয়ার কথা সেখানে তাদের শক্তি ক্ষয় করতে হচ্ছে মৌলিক প্রতিকূলতা ডিঙাতে।
একজন ব্যবসায়ী যখন একটি রেস্টুরেন্ট চালু করেন, তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন, ভ্যাট ও কর প্রদান করেন, মানুষের বিনোদন ও খাদ্যসেবা নিশ্চিত করেন এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। তাহলে তার রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি পার্কিং নিয়ে কেন প্রতিনিয়ত হয়রানির মুখোমুখি হতে হবে? এ সমস্যা শুধু রেস্টুরেন্টেরেই নয়, এটি সমগ্র দেশের ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের দৈনন্দিন রাষ্ট্রীয় হয়রানির এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। ভাবুন তো, সরকারের রাজস্বের বড় জোগানদাতা হয়েও একজন উদ্যোক্তাকে পার্কিং বা সামান্য ইউটিলিটি সেবার জন্য কেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভুগতে হবে?
ট্রাফিক পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনোভাব হওয়া উচিত সহযোগিতা করা। কীভাবে সঠিকভাবে পার্কিং ব্যবস্থা করা যায়, কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, কীভাবে গ্রাহকরা নিশ্চিন্তে সেবা গ্রহণ করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা।
একইভাবে, খাদ্য ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনোভাব হওয়া উচিত শুধুমাত্র শাস্তি দেওয়া নয় বরং নিয়মিত পরামর্শ, প্রশিক্ষণ এবং সহযোগিতার মাধ্যমে মান উন্নয়নে সহায়তা করা। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর চরিত্র ‘পেনাল্টি-বেসড’ (শাস্তিমূলক) না হয়ে ‘কমপ্লায়েন্স-বেসড’ (সহযোগিতামূলক) হওয়া জরুরি। জরিমানা বা সিলগালা করাই সমাধান নয় বরং সক্ষমতা বৃদ্ধি ও গাইডলাইন দেওয়াই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। এটা একটা উদাহরণ হিসেবে বললাম।
আমার মতে, সরকারকে ব্যবসায়ীদের প্রতিপক্ষ বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে নয় বরং অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। ব্যবসায়ী যদি কিছু করতে চান, সরকারের বলা উচিত; চলুন, আমরা একসঙ্গে করি। আপনার কী প্রয়োজন, বলুন; আমরা কীভাবে সহযোগিতা করতে পারি, সেটি দেখি।







