মাওলানা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত লেখক, সাংবাদিক ও রাজনীতিক। তিনি ২২ আগস্ট ১৮৭৫ সালে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বরমা-আড়ালিয়ার চর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাচীন চট্টগ্রামের নাম ইসলামাবাদের অনুকরণে নামের শেষে ‘ইসলামাবাদী’ পদবি গ্রহণ করেন। পারিবারিক পরিমণ্ডলে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনের পর উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা গমন করেন।
পশ্চিমবঙ্গের হুগলি সরকারি মাদরাসা থেকে ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। আরবি, উর্দু, ফারসি ভাষায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করলেও বাংলা ভাষা চর্চায় তাঁর ছিল বিশেষ মনোযোগ। মাওলানা ইসলামাবাদী শিক্ষাজীবন শেষে রংপুরের হারাগাছ মাদরাসার অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড মাদরাসায় অধ্যক্ষ হিসেবে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। সে সময় বাংলা ও আসামের বিভিন্ন স্থানে স্কুল ও মাদরাসা স্থাপনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কলকাতায় অবস্থানকালে মাওলানা জৈনপুরীর আদর্শে ইসলাম প্রচার, স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আদর্শে মুসলিম জাগরণ, নওয়াব আবদুল লতিফের আদর্শে শিক্ষা বিস্তার ও জামালউদ্দীন আফগানির ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন।
শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক এমরান চৌধুরী কর্তৃক রচিত ‘যুগের প্রতীক মওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী’ গ্রন্থে তাঁর শৈশব-কৈশোরের দুরন্তপনার কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে শহরে মহররমের খেলা দেখতে ৫-৬ জন বন্ধু মিলে মক্তব থেকে পালিয়ে যান। অর্থকড়ি ছাড়া অচেনা শহরে শেষমেশ তাঁরা আশ্রয় নিয়েছিলেন খাতুনগঞ্জের হামিদউল্লাহ খাঁ মসজিদের বারান্দায়।
প্রাবন্ধিক ও গবেষক আহমদুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর একটি লেখায় উল্লেখ করেন, মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীর মাদরাসায় অধ্যয়নকালে হেড মাওলানা কুতবুল আলম পীরে কামেল হজরত শাহ মাওলানা সুফি গোলাম সালমান আব্বাসীর (রহ.) সান্নিধ্যে মনের গভীর রূপান্তর ঘটে। এরপর থেকেই তিনি সুফিবাদ ও তাসাউফের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা পোষণ করতে থাকেন—যা এছলামাবাদী তাঁর আত্মজীবনীতেও স্বীকার করেছেন।
মওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী ২০ বছর বয়সে, অর্থাৎ ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে, চট্টগ্রাম থেকে মাইজভাণ্ডার গমন করেন হজরত শাহ মাওলানা আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারীর সান্নিধ্যে। জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে মোক্তারি (আইনপেশা) পরীক্ষা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি হজরত মাইজভান্ডারীর উপদেশ ও দোয়া কামনা করেন। তাঁর পুনঃপুন আগ্রহের প্রেক্ষিতে হজরত আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী কোরআনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করেন, যার মর্মার্থ ছিল—আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই মানুষের কর্তব্য; আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিজিক দান করেন। এতে মাওলানা এছলামাবাদী উপলব্ধি করেন যে, রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর ওপরই সম্পূর্ণ ভরসা রাখা উচিত।
মওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী সম্পাদিত ও প্রকাশিত প্রথম উল্লেখযোগ্য সংবাদপত্র ‘সাপ্তাহিক ছোলতান’। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯০৩ সালে চট্টগ্রাম থেকে। পরবর্তী পর্যায়ে পত্রিকাটির কার্যালয় কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। ব্রিটিশদের কালাকানুন এবং আর্থিক সংকটের কারণে ১৯১০ সালে ‘সাপ্তাহিক ছোলতান’-এর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।
পত্রিকা বন্ধ হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর ‘হতাশ জীবন’ গ্রন্থে লিখেছেন: “১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ‘বঙ্গীয় মুসলমান শিক্ষা সমিতি’ ও ‘ছোলতান পত্রিকা’ পরিচালনাকালে জীবনসংগ্রামে অর্থসংকটের পালা আরম্ভ হয়। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অতি কষ্টে শত দুঃখ, দৈন্য ও অভাব-অনটনের ভিতর দিয়া ‘ছোলতান পত্রিকা’ পরিচালনা করি। ১৯১০ অব্দে চট্টগ্রামের অর্থসাহায্যে আবার ‘ছোলতান’ অফিস চট্টগ্রামে স্থানান্তর করি। কিন্তু মাক এয়াকুব আলী দোভাষীর আকস্মিক মৃত্যুতে এক বৎসর পর আবার অর্থসংকটে ছোলতান কাগজ বন্ধ হইয়া যায়।”
১৯২৩ সালে কলকাতার ৪৭/১ মির্জাপুর স্ট্রিট থেকে মওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী ও কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর যৌথ পরিচালনায় ‘সাপ্তাহিক ছোলতান’ নতুন পর্যায়ে প্রকাশিত হয়। মাত্র তিন বছরের মাথায় এটি দৈনিকে রূপান্তরিত হয়। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে মওলানা মনিরুজ্জামানের একক কর্তৃত্বে প্রকাশিত হয় ‘দৈনিক ছোলতান’। এতে সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক লেখার পাশাপাশি মুসলিম সমাজের সার্বিক উন্নয়নে পত্রিকাটি মুখ্য ভূমিকা পালন করত।
দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ‘Sultan Board of Trustees’-এর সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় তিনি পত্রিকাটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। চট্টগ্রামের সৌখিন অ্যান্টিক সংগ্রাহক ও সমাজসেবী তারিকুল ইসলাম জুয়েল ভাইয়ের সংগ্রহে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের একটি বিরল ‘দৈনিক ছোলতান’ দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সেই পত্রিকায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কিংবদন্তি মাস্টারদা সূর্য সেনকে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে ধরিয়ে দেওয়ার একটি সংবাদ ছাপা হতে দেখেছি।
মওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী চট্টগ্রামে একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন; কিন্তু অর্থাভাব ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। কথাশিল্পী অধ্যাপক আবুল ফজল দুঃখভরে লিখেছেন:
‘মনিরুজ্জামান সারা জীবনই সমাজ সম্বন্ধে ভেবেছেন, চিন্তা করেছেন, স্বপ্নের বীজ বপন করতে চেয়েছেন বহু ক্ষেত্রে। মাটি অনুকূল ছিল না বলে হয়তো এসব বীজের অনেকগুলোই অঙ্কুরিত হতে সুযোগ পায়নি।’
মনিরুজ্জামানের অন্তরে দুঃখীদের ক্রন্দন ও জাতির দুর্দশা সবসময় রক্তক্ষরণ ঘটাত। তিনি আত্মসুখ বিসর্জন দিয়ে পরহিতব্রতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। অনাথ-নিরাশ্রয় শিশুদের শিক্ষার প্রসারে তিনি ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ‘কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা’। পাশাপাশি তিনি কদম মোবারক এম. ওয়াই উচ্চ বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেন।
বর্তমান কদম মোবারক এতিমখানা পরিচালনা কমিটির প্রতি আমার বিনীত আহ্বান—যুগোপযোগী সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও বাস্তবমুখী কারিগরি শিক্ষাদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক; যাতে তারা তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্প ও যন্ত্রপাতির দক্ষ ব্যবহারে পারদর্শী হয়ে গড়ে উঠতে পারে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নির্ভীক সেনানী এবং উপমহাদেশে মুসলিম সাংবাদিকতার এই পথিকৃৎ আজীবন সংগ্রাম করতে করতে ১৯৪৭ সালে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। শেষ জীবনে তিনি নিদারুণ অর্থকষ্টেও ভোগেন। অবশেষে অনেকটা নীরবে, অবহেলা ও অনাদরে ১৯৫০ সালের ২৪ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম শহরের কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা ও নবাব ইয়াসিন খাঁ মসজিদ চত্বরে তাঁকে সমাহিত করা হয়। মহীরুহ এই শিক্ষাবিদের প্রয়াণ দিবসে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
সমাধিফলকে উৎকীর্ণ করার জন্য মওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী নিজেই লিখে গিয়েছিলেন তাঁর স্মৃতিলেখন: ‘পথিক: ক্ষণেকের তরে বস মোর শিরে, ফাতেহা পড়িয়া যাও নিজ নিজ ঘরে। যে জন আসিবে মোর সমাধির পাশে, ফাতেহা পড়িয়া যাবে মম মুক্তির আশে। অধম মনিরুজ্জামান নাম যে আমার, এছলামাবাদী বলে সর্বত্র প্রচার।’
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী এক আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনে নিষ্পেষিত বাঙালি মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। এই মনীষীর কর্ম ও দর্শন নিয়ে নিরন্তর গবেষণা করা এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে তাঁর আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের সবার জাতীয় দায়িত্ব। চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে আমি গর্বিত যে এমন একজন মনীষী এই পুণ্যভূমিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দেশ-বিদেশের পরিমণ্ডলে তিনি চিরভাস্বর। সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাঁর বিশাল কর্মময় জীবন তুলে ধরা দুরূহ। পৌনে এক শতাব্দী আগে তিনি বিদায় নিলেও তাঁর আদর্শ, ত্যাগ ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। ইতিহাসই এই নির্ভীক কর্মবীরকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
লেখক: সমাজকর্মী ও চিন্তক





