জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধ্বস বিজয়ের পর চট্টগ্রামে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য আসনকে ঘিরে। দলীয় ও রাজনৈতিক মহলে সম্ভাব্য কয়েকজন নারীনেত্রীর নাম ঘুরে বেড়ালেও আলোচনার অগ্রভাগে উঠে এসেছে সাবেক সংসদ সদস্য বেগম রোজি কবিরের সন্তান ডা. ফারাহনাজ মাবুদের নাম।
বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দলের সঙ্গে জড়িত থাকা মা রোজি কবির সংরক্ষিত নারী আসন থেকে তিন তিনবার এমপি হয়েছেন। ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও রেখেছিলেন সক্রিয় ভূমিকা। এবার মায়ের সেই রাজনৈতিক-মানবিক উত্তরাধিকার বহন করে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে এগিয়ে এসেছেন কন্যা ডা. ফারাহনাজ মাবুদ।
জানা যায়—মায়ের পাশে থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আবহে বড় হওয়া ডা. ফারাহনাজ মাবুদ শৈশব থেকেই রাজনীতি ও মানবসেবার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। সংস্কৃতি চর্চায়ও হাতেখড়ি হয় বাল্যকাল থেকেই। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ের শিশুশিল্পী, ‘অগ্নিবীণা’ জাতীয় সঙ্গীত প্রতিযোগিতার পুরস্কারজয়ী শিল্পী এবং ১৯৯৩ সালে নতুন কুঁড়ি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান সঞ্চালনার মধ্য দিয়ে তিনি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডেও ডা. ফারাহনাজ মাবুদ সরাসরি যুক্ত। বর্তমানে ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (FPAB)-এর জাতীয় কাউন্সিলর, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সিটি ইউনিটের কার্যকরী সদস্য, রেড ক্রিসেন্ট ইয়ুথ অ্যালামনাই-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডক্টর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব ) আজীবন সদস্য হিসেবে সামাজিক ও মানবিক কাজেও সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছেন।
শিক্ষাজীবনে ডা. ফারাহনাজ ফাতিমা জিন্নাহ মেডিকেল কলেজ, লাহোর (সার্ক ও G2G স্কলারশিপের মাধ্যমে) থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন; পরবর্তীতে এমসিপিএস, এমএস (অবস অ্যান্ড গাইনী) সম্পন্ন করে নিজেকে একজন দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তিনি ভারতের বেঙ্গালুরুতে রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিনে ফেলোশিপ, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের মার্সি হসপিটাল ফর উইমেন–এ RANZCOG-এর স্কলারশিপে আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ, যুক্তরাজ্যের RCOG কংগ্রেসে পোস্টার প্রেজেন্টেশন, অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে RANZCOG AGM, থাইল্যান্ড, ভারত, বাংলাদেশসহ একাধিক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে স্পিকার ও ডেলিগেট হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন।
এছাড়া একজন গবেষক হিসেবে ডা. ফারাহনাজের ১১টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি তিনি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগং (ইউএসটিসি)-এ দীর্ঘ ১১ বছর শিক্ষকতা ও রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধারণ করে এবং প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা হিসেবে বেগম রোজি কবির বিএনপির রাজনীতিতে এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, পরবর্তী সময় থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দিনগুলোতে তাঁর বাসভবন ও প্রতিষ্ঠান ‘হোটেল শাহজাহান’ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।
শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনীতি থেকে শুরু করে ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, তারপর ১/১১ ; সবকটি জরুরি সময়কাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে বিএনপির রাজনীতির যে স্নায়ুকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল, তার অন্যতম স্থপতি ছিলেন বেগম রোজি কবির। তিনি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সদস্য হিসেবে নগর উন্নয়ন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবে উচ্চশিক্ষা এবং জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটিতে থেকে নারী–শিশু ও সমাজকল্যাণের নীতিনির্ধারণী কাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (UNGA), বিমসটেক, সার্ক ও বিশ্ব সামাজিক উন্নয়ন সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে লিভার সমস্যাজনিত কারণে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
ডা. ফারাহনাজ মাবুদের রাজনৈতিক দর্শন মায়ের মতোই গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নারীর মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আদর্শে বিশ্বাসী। তিনি মনে করেন – চট্টগ্রামের মানুষের ত্যাগ, বিএনপির দীর্ঘ সংগ্রাম, এবং এই অঞ্চলের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে মূল্যায়ন করতে হলে নারীদের সংরক্ষিত আসনে চট্টগ্রাম থেকে সৎ, শিক্ষিত, পেশাগতভাবে সফল ও মানবসেবায় প্রমাণিত নেতৃত্বকে সামনে আনতে হবে।
চট্টগ্রাম-বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি —চট্টগ্রাম থেকে বিএনপি যে ১৪টি আসনে বিজয় অর্জন করেছে, সেই রাজনৈতিক ও নৈতিক স্বীকৃতি হিসেবে নারীদের সংরক্ষিত আসনে বেগম রোজি কবিরের কন্যা ডা. ফারাহনাজ মাবুদকে মনোনয়ন দেওয়া হলে তা হবে চট্টগ্রামের মানুষের ত্যাগ সংগ্রামের সম্মাননা এবং একই সঙ্গে নারী নেতৃত্ব বিকাশের এক উজ্জ্বল মাইলফলক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে—বাংলাদেশ পুনর্গঠনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নতুন, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বকে সামনে আনার নীতি গ্রহণ করেছে, যেখানে পেশাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও মানুষের প্রতি নিবেদিত সেবা বোধকে প্রধান মানদণ্ড ধরা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং দীর্ঘদিন ধরে মানবসেবা ও সামাজিক কাজে সরাসরি যুক্ত ডা. ফারাহনাজ মাবুদকে চট্টগ্রাম থেকে নারীদের সংরক্ষিত আসনে একটি সময়োপযোগী ও যোগ্য প্রতিনিধিত্বশীল মুখ হিসেবে বিবেচনা করলে, তা নতুন প্রজন্মের নারীনেতৃত্বকে এগিয়ে নেওয়ার বাস্তব উদাহরণ হতে পারে।





