পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফেরার পর আমাদের সমাজে খুব চেনা একটি ঘটনা হলো, অভিভাবকেরা প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে সন্তানের মুখোমুখি বসে পড়েন। কোন প্রশ্নের উত্তর কী লেখা হয়েছে, কয়টা ভুল হলো; চলে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু তামযীদ তাহসীন রেজার (তামাম) বাসার চিত্রটা ছিল একদমই উল্টো।
পরীক্ষা শেষে বাসায় ফেরার পর তামযীদকে কখনোই এমন দ্বিতীয় দফার ‘মৌখিক পরীক্ষা’র মুখোমুখি হতে হয়নি। ছিল না ভালো ফলাফল করার জন্য মা-বাবার কোনো বাড়তি চাপও বরং নিজের আনন্দ আর আগ্রহের টানে দিনে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পড়াশোনা করেই ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় পুরো চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে প্রথম স্থান অর্জন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন চুয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই মেধাবী শিক্ষার্থী।
গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, এবার চট্টগ্রাম বোর্ডে সামগ্রিক পাসের হার ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ। মোট ৯৯ হাজার ৮৭৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫০ হাজার ১৬৬ জন, আর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৯২৯ জন। এই প্রায় এক লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭টি বিষয়ে সর্বমোট ১ হাজার ২২২ নম্বর পেয়ে সবার শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছেন তামযীদ।

তামযীদের বিষয়ভিত্তিক নম্বরগুলোর দিকে তাকালেই মেধার ধার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পদার্থবিজ্ঞানে ২০০ নম্বরের মধ্যে তিনি পেয়েছেন ১৯৭, এ ছাড়া উচ্চতর গণিতে ১৯৪, জীববিজ্ঞানে ১৯৪, রসায়নে ১৯৩, বাংলায় ১৭৫, ইংরেজিতে ১৭৩ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে (১০০ নম্বরের মধ্যে) ৯৬ নম্বর পেয়েছেন তিনি। এর আগে এসএসসি পরীক্ষাতেও ১ হাজার ২৪৭ নম্বর পেয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছিলেন এই মেধাবী তরুণ।
অথচ এমন ঈর্ষণীয় ফলাফলের পেছনে দিনরাত কেবল বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকার গতানুগতিক কোনো গল্পই নেই। পড়াশোনার বাইরেও তামযীদের রয়েছে এক রঙিন ও সৃজনশীল জগৎ। অবসরে তিনি ভালোবাসেন কবিতা আবৃত্তি করতে, ছবি আঁকতে এবং কম্পিউটারে গ্রাফিক্স ডিজাইনিং নিয়ে কাজ করতে। এসব শখের সাথে পাল্লা দিয়েই নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছেন প্রতিদিনের পড়াশোনা।
নিজের এই সাফল্যের পেছনে সৃষ্টিকর্তার রহমত, নিজের অধ্যবসায়, মা-বাবার ত্যাগ ও শিক্ষকদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে তামযীদ বলেন, ‘পড়ার টেবিলে যতক্ষণ থাকতেন, ততক্ষণ পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করতেন। গড়পড়তা দিনে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পড়তেন তিনি। সবুজে ঘেরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বেড়ে ওঠা তামযীদের স্বপ্ন এখন একজন দক্ষ প্রকৌশলী হওয়া। ফলাফল প্রকাশের পর নিজের সেই স্বপ্নের কথাই জানিয়েছেন তিনি; বর্তমানে নিচ্ছেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি।’
তামযীদের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের শ্রীপতিপুর পাঁচপাড়া গ্রামে। তবে বাবা ড. রেজাউল করিম চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হওয়ায় বাবার কর্মস্থলের সুবাদে চট্টগ্রামে থেকেই পড়াশোনা করেছেন তিনি। বোর্ডসেরা হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে তাঁর গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধাতেও বইছে আনন্দের বন্যা।
ছেলের এই অর্জনে ভীষণ আনন্দিত মা শামসুন্নাহার বেগম। অভিভাবক হিসেবে নিজেদের ভূমিকার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ছেলের ওপর কখনোই আমরা পড়াশোনা চাপিয়ে দিইনি। ও নিজের আগ্রহ ও আনন্দ থেকেই পড়েছে। এমনকি পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফেরার পর প্রশ্নের উত্তর মিলিয়ে দেখার জন্যও তাকে কখনো জেরার মুখোমুখি হতে হয়নি।’
অন্যদিকে ছেলের সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বাবা অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, ‘তামযীদ নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে এবং সে অনুযায়ীই ভালো ফলাফল পেয়েছে।’ ছেলের উচ্চশিক্ষা ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।
কেএমএইচ/এমএনএ





