গ্রামের পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ, বর্ষার দিনে তালপাতার ছায়া, পাকা তালের ঘ্রাণ বা তাল দিয়ে তৈরি পিঠা-পায়েস; সবকিছুর সঙ্গে মিশে আছে বাংলার খাদ্য, প্রকৃতি ও লোকজ সংস্কৃতির এক দীর্ঘ স্মৃতি।
এবার এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এউডব্লিউ) সান ভ্যালি ক্যাম্পাসে বসেছিল ‘পালমিরা ফ্রুট ফেস্টিভ্যাল ২০২৬’। যেখানে সেই পরিচিত তালগাছই এবার হয়ে উঠেছিল প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের মিলনমেলার কেন্দ্রবিন্দু।


তালকে ঘিরে আয়োজিত এ উৎসবে খাবার, শিল্প, গান, নাচ, খেলাধুলা ও পরিবেশ সচেতনতা; সবকিছু মিলেমিশে তৈরি করেছে ভিন্নধর্মী এক আয়োজন।
২৪ সেপ্টেম্বর টেল স্পেসে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী এ উৎসবের আয়োজন করে এউডব্লিউর এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিভাগের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ক্লাব ও গ্রিন বেঙ্গল প্রজেক্ট। সহযোগিতায় ছিল এউডব্লিউ আর্ট ক্লাব।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন পরিবেশবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান প্রোগ্রামের পরিচালক ড. পলরাজ মোসাই সেলভাকুমার।
তালগাছ থেকে জীবনের পাঠ
উৎসবের মূল সুরটি যেন ধরা পড়েছিল ড. পলরাজ মোসাই সেলভাকুমারের বক্তব্যে। তালগাছকে তিনি দেখিয়েছেন শুধু একটি গাছ হিসেবে নয় বরং স্থায়িত্ব, ধৈর্য ও বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে।

বক্তব্যে কলা, নারিকেল ও তাল; এ তিনটি গাছের উদাহরণ টেনে তিনি বন্ধুত্বের তিন ধরনের রূপের কথা তুলে ধরেছেন। কলাগাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে, দ্রুত ফল দেয় কিন্তু একটি পর্যায়ের পর তার জীবন শেষ হয়ে যায়। নারিকেলগাছের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত যত্ন ও পরিচর্যা। আর তালগাছ? তার বেড়ে ওঠা ধীর। দীর্ঘ সময় ধরে মাটির গভীরে শেকড় বিস্তার করে সে নিজের জায়গা তৈরি করে।
একবার শক্তভাবে দাঁড়িয়ে গেলে ঝড় তাকে সহজে উপড়ে ফেলতে পারে না, খরাও তাকে সহজে শুকিয়ে দিতে পারে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সে মানুষকে দিয়ে যায় তার ফল ও নানা উপকার।
এ উদাহরণ থেকেই ড. পলরাজের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, Live like the palmyra। অর্থাৎ তালগাছের মতো বাঁচো। তাঁর বক্তব্যে তালগাছ যেন হয়ে উঠেছিল জীবনের আরেকটি একটি রূপক অর্থ। যেখানে দ্রুত ফল পাওয়ার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠা, প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকা এবং অন্যের জন্য কিছু রেখে যাওয়াই বড় হয়ে ওঠে।
সাজসজ্জাতেও বাংলার গ্রাম
উৎসবস্থলে ঢুকলেই চোখে পড়েছে বাংলার গ্রামীণ জীবনের ছাপ। তাল, নারিকেল, আম ও কলাগাছের বিভিন্ন অংশ দিয়ে সাজানো হয়েছিল অনুষ্ঠানস্থল। তাল ফল, শিল্পকর্ম ও হাতে তৈরি বিভিন্ন উপকরণও জায়গা করে নিয়েছিল সাজসজ্জায়।

আয়োজনের পোশাকের থিমেও ছিল তাল ফলের উপস্থিতি। কমলা ও বাদামি রঙের পোশাকের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়েছিল তাল ফলের ভেতর ও বাইরের রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য।
তালের স্বাদে ২৬ রকমের গল্প
তাল ফলকে আমরা সাধারণত কয়েকটি পরিচিত খাবারের সঙ্গেই ভাবি। পিঠা, পায়েস কিংবা বড়জোর হালুয়া। কিন্তু এউডব্লিউর উৎসবে সেই পরিচিত ধারণাটিও বদলে গেল। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাল দিয়ে তৈরি করেছিলেন ২৬ ধরনের খাবার। তাল কাস্টার্ড, কেক, পিঠা, হালুয়া, পায়েস, রসগোল্লা, আচার, ইডলি থেকে কুনাফা—এভাবে চিরচেনা তাল ঢুকে পড়েছিল পরিচিত ও অপরিচিত নানা রেসিপিতে। একটি ফল কতটা বহুমুখী হতে পারে, খাবারের আয়োজনটি যেন তারই ছোট্ট প্রদর্শনী।
সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্যের তালভিত্তিক খাবারের স্টল ‘পালমিরা কিচেন ক্রিয়েশন’ এতে প্রথম পুরস্কার অর্জন করে।
খাবারের বাইরে গান, নাচ আর খেলা
উৎসব মানেই শুধু প্রদর্শনী নয়, ছিল গান ও নাচের আয়োজন। ছিল ট্রেজার হান্ট, ‘মিউজিক্যাল পালমিরা’ এবং রিং-থ্রোয়িংয়ের মতো খেলাও।
তালকে ঘিরে তৈরি এ খেলাগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অংশ নিয়েছেন এউডব্লিউ ল্যাব স্কুলের শিশুরাও। ফলে পরিবেশ সচেতনতার বিষয়টি কোনো বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তা হয়ে উঠেছিল আনন্দ, অংশগ্রহণ ও অভিজ্ঞতার বিষয়।
পরিচিত গাছ, নতুন করে চেনা
তালগাছ বাংলার মানুষের কাছে নতুন কিছু নয় বরং এতটাই পরিচিত যে, অনেক সময় তার গুরুত্বই চোখ এড়িয়ে যায়। এ উৎসব সেই পরিচিত জিনিসটিকেই নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে। তাল ফলের স্বাদ থেকে শুরু করে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা খাদ্যসংস্কৃতি, গাছের বিভিন্ন অংশের ব্যবহার, গ্রামীণ জীবন ও স্থানীয় জ্ঞানের বিষয়গুলো উঠে এসেছে উৎসবের নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে।
ফলে এখানেই আয়োজনটির পরিবেশগত বার্তাটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরিবেশ সচেতনতা সবসময় দূরের কোনো বিষয় দিয়ে শুরু করতে হবে—এমন নয়। আমাদের চারপাশের গাছ, খাবার, ঐতিহ্য ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক বুঝেও সেই সচেতনতার শুরু হতে পারে।
প্রকৃতি যখন উৎসবের ভাষা
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন এউডব্লিউর উপাচার্য ড. সঙ্গীতা রায়মাঝি। উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য দেন ড. পলরাজ মোসাই সেলভাকুমার, আমেনা বেগম বিপিএম, বিপিএম (বার), ডিআইজি (অব.), ডেপুটি রেজিস্ট্রার; ড. মোহিউদ্দিন আহসানুল কবির চৌধুরী, ড. আহমেদুল কবির, ড. শান্তা দত্ত এবং আফরিদা আসাদ।
অতিথি ছিলেন কেএফএল ফিশ মিল লিমিটেড ও সোনাপাহাড় ইকো রিসোর্টের পলক পল, পিএইচপি ফ্যামিলির দিলশাদ আহমেদ এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও দ্য ক্লাইমেট ওয়াচের শামসুদ্দিন ইলিয়াস।
এ ছাড়া অধ্যাপক ড. হাসিনা খান, জেনারেল এডুকেশনের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, ড. অয়ন রায়, ড. অয়ন সাহা, দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ডমিনিকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন।
এরপর দিনের শেষে বিভিন্ন খেলা ও কার্যক্রমে অংশ নেওয়া বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। তবে পুরস্কার কিংবা প্রতিযোগিতার হিসাবের বাইরে উৎসবটির বড় অর্জন ছিল অন্য জায়গায়—একটি পরিচিত গাছকে ঘিরে মানুষকে আবার এক জায়গায় নিয়ে আসার গল্প।





