শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের ‘তাত্ত্বিক পড়ালেখা’ ছেড়ে এবার সরাসরি প্রকৃতির কাছাকাছি গিয়েই শিক্ষা-অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন একদল শিক্ষার্থী। গাছ বেয়ে উপরে ওঠার এক বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পরিবেশ শিক্ষার এ নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (AUW) ‘গ্রিন ব্যাংগল প্রকল্প’।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির মূল ক্যাম্পাসে ‘বৃক্ষারোহণ’ শীর্ষক শিরোনামে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীসহ প্রায় ৩০ জন অংশ নেন। এতে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন ড. মোসে সেলভাকুমার পলরাজ।
প্রশিক্ষণের শুরুতে একটি বিশেষ ধরনের বৃক্ষারোহণ পদ্ধতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এরপর একটি ক্লাইম্বিং মেশিনের সাহায্যে অংশগ্রহণকারীরা নিরাপদে গাছে ওঠেন এবং সরাসরি প্রকৃতির সংস্পর্শে গিয়ে পরিবেশ সম্পর্কে ব্যবহারিক ধারণা লাভ করেন। প্রথম দেখায় গাছে ওঠা একটি সাধারণ ব্যাপার মনে হলেও আয়োজকরা জানান—প্রকৃতপক্ষে এটি একটি শক্তিশালী শিক্ষামাধ্যম, যা সরাসরি মানুষকে শারীরিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে নতুন করে সংযুক্ত করে তুলে। একটি জীবন্ত গাছের সাথে এ প্রত্যক্ষ সংযোগের ফলে শিক্ষার্থীরা এখানে মানুষ ও প্রকৃতির পারস্পরিক গভীর সম্পর্কটি উপলব্ধি করতে পেরেছে।
আয়োজকদের মতে, এ প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত বিশেষ আরোহন পদ্ধতিতে হাত, পা, ভারসাম্য ও শরীরের নিয়ন্ত্রণকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হয়। যা কেবল শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয় বরং কৌশল, মনোযোগ, ছন্দ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। ফলে অনায়াসে ভিন্ন ভিন্ন শারীরিক সক্ষমতার মানুষও এতে অংশ নিতে পারেন। যা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, সহনশীলতা ও আত্মসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
পরিবেশ শিক্ষার ক্ষেত্রে এ আয়োজনটিকে ‘ইকোফেমিনিস্ট’ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে তারা আরও জানান, এ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকৃতির সঙ্গে সবার অন্তর্ভুক্তিমূলক সংযোগ, পরিবেশ রক্ষায় যৌথ দায়িত্ববোধ এবং পরিবেশ ও বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়। পাশাপাশি এটি ঐতিহ্যগত সেই ধারণাগুলোকেও চ্যালেঞ্জ করে, যা দীর্ঘদিন ধরে নারীদের বহিরাঙ্গণ ও প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রমে অংশগ্রহণ সীমিত করেছে।
এ সময় প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত ক্লাইম্বিং মেশিনটি সহজপ্রাপ্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ বলে জানান তারা। সঠিক নির্দেশনা ও উপযুক্ত সরঞ্জামের মাধ্যমে প্রথমে কঠিন মনে হওয়া কাজও যে অনেকের জন্য সম্ভব হয়ে ওঠে, তা অংশগ্রহণকারীরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে। তারা শিখেছে, পরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কেবল শারীরিক শক্তির বিষয় নয় বরং দক্ষতা, অভিযোজনক্ষমতা, শেখার আগ্রহ এবং দৃঢ়তার বিষয়।
পরিবেশবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এ কার্যক্রম অংশগ্রহণকারীদের একটি গাছকে কেবল কাঠ বা ছায়া হিসেবে না দেখে, ‘জীবন্ত পরিবেশগত ব্যবস্থা’ হিসেবে দেখতে উদ্বুদ্ধ করে। গাছ কীভাবে কার্বন শোষণ, বায়ু পরিশোধন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, মাটি সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সেবা দেয়; তা শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অনুভব করেছে।
এছাড়া প্রশিক্ষণে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্বও তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন গবেষণার কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, প্রকৃতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা পরিবেশ সম্পর্কে বোঝাপড়া বৃদ্ধি করে, সংরক্ষণমুখী আচরণকে উৎসাহিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত দায়িত্ববোধ গড়ে তোলে। বৈজ্ঞানিক ধারণার সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে এ কার্যক্রম তাত্ত্বিক-জ্ঞানকে ব্যবহারিক শিক্ষায় রূপ দেয়।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা জানান, এ বৃক্ষারোহন শুধু একটি প্রযুক্তিগত অনুশীলন না বরং এটি ভয় ও দ্বিধা কাটিয়ে ওঠা, আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা এবং নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবেশ শিক্ষা গ্রহণের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এতে ধাপে ধাপে উপরে ওঠার প্রক্রিয়াটি ব্যক্তিগত বিকাশ, অধ্যবসায় ও দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবেও প্রতিফলিত হয়।
প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নার্সারিও পরিদর্শন করেন। সেখানে তারা চলমান উদ্ভিদ পরিচর্যা কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারে এবং নতুন যোগ দেওয়া ইন্টার্ন ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে। এ সময় শিক্ষার্থীরা নার্সারি ব্যবস্থাপনা, উদ্ভিদ বংশবিস্তার, পরিচর্যা এবং ক্যাম্পাসের সবুজায়ন ও পরিবেশগত স্থায়িত্বে নার্সারির ভূমিকা সম্পর্কেও সম্যক ধারণা লাভ করে।
প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে ড. মোসে সেলভাকুমার পলরাজ বলেন, এ প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য কেবল গাছে ওঠার কৌশল শেখানো নয় বরং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, কৌতূহল জাগ্রত করা এবং জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নারীদের প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও শক্তিশালী করা।
তিনি আরও বলেন, গ্রিন ব্যাংগল প্রকল্প পরিবেশ শিক্ষায় উদ্ভাবনী পদ্ধতি প্রয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা ও পরিবেশগত নেতৃত্ব বিকাশের অর্থবহ সুযোগ তৈরি করে যাচ্ছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা শুধু একটি নতুন কারিগরি অভিজ্ঞতাই অর্জন করেনি বরং মানুষ, প্রযুক্তি ও প্রকৃতির আন্তঃসম্পর্ক সম্পর্কে আরও গভীর উপলব্ধিও লাভ করেছে।
অনুষ্ঠানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু সফলভাবে সমন্বয় করেছেন গ্রিন ব্যাংগল প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প ব্যবস্থাপক শাইকা মোহাম্মদ চৌধুরী এবং স্টুডেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট মিথিলা জাহান।







