জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে কেবল সহায়তার গ্রহীতা হিসেবে নয় বরং জলবায়ু নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার অংশীদার করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশ-বিদেশের গবেষকেরা। তাঁদের মতে, জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বকে নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব দিতে হবে।
‘Commoning Our Futures with Climate Justice’ প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও জলবায়ু কার্যক্রম সম্মেলন ICECA2026-এ এ আহ্বান জানানো হয়।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (AUW) পরিবেশবিজ্ঞান কর্মসূচির উদ্যোগে ৭ ও ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে গ্লোবাল সাউথসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ১৫০ জনের বেশি গবেষক, নীতিনির্ধারক ও শিক্ষার্থী অংশ নেন। সম্মেলনে জলবায়ু ন্যায়বিচার, বিজ্ঞানভিত্তিক জলবায়ু নীতি, জলবায়ু অর্থায়ন, নারীর নেতৃত্ব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সম্মেলনের মূল বক্তাদের একজন যুক্তরাষ্ট্রের টুলেন ইউনিভার্সিটির ড. ন্যান্সি মক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী এবং তাঁদের নেতৃত্ব দেওয়া নারীদের শুধু মতামত নেওয়ার পর্যায়ে রাখলে হবে না; তাঁদের নীতি ও নিয়ম তৈরির প্রক্রিয়ার অংশ করতে হবে।
মিসিসিপি নদীর বদ্বীপ ও বাংলাদেশের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ নিয়ে তাঁর গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাস্তুচ্যুতি ও পুনরুদ্ধারের সময়ে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়ন ও প্রকৌশল পরিকল্পনার আলোচনায় তাঁদের অবদান অনেক সময় দৃশ্যমান থাকে না।
সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান ড. মোসায়ে সেলভাকুমার পলরাজ জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় টেকসই উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। কার্বন ক্রেডিট থেকে পাওয়া অর্থ যেন কৃষক, পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় নারীদের মতো পরিবেশ সংরক্ষণে সরাসরি যুক্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়, সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাংলাদেশের চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান ভার্চুয়ালি দেওয়া বক্তব্যে ‘Natural Rights-Led Governance’ বা প্রকৃতির অধিকারভিত্তিক শাসনব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেন। প্রকৃতিকে শুধু মানুষের ব্যবহারের সম্পদ হিসেবে না দেখে অধিকারসম্পন্ন অংশীদার হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিজ্ঞানের ভূমিকা
সম্মেলনের উদ্বোধনী প্লেনারি অধিবেশনে ‘Natural Science for Climate Action: Charting Ways Forward’ শীর্ষক আলোচনায় তুরস্ক, ভারত, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের গবেষকেরা অংশ নেন।
আলোচনায় জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, জীবপ্রযুক্তি, রোগবাহী জীবাণুর বিস্তার, কার্বন পর্যবেক্ষণ এবং বনসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
গবেষকেরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৈজ্ঞানিক গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু প্রযুক্তিগত সমাধান যথেষ্ট নয়। স্থানীয় বাস্তবতা, জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দিয়ে জলবায়ু নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
পুনর্গঠনের দাবি জলবায়ু অর্থায়নে
‘Evidence-Based Climate Policy: A Vision for COP31’ শীর্ষক প্লেনারি অধিবেশনে জলবায়ু অর্থায়নের কাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়।
বক্তারা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য অভিযোজন ও প্রশমন অর্থায়ন পুনর্গঠনের আহ্বান জানান। তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ওপর তৈরি হওয়া ঋণের বোঝা কমাতেও জলবায়ু অর্থায়ন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের প্রোগ্রাম ম্যানেজার তানজিনা দিলশাদ জলবায়ু অর্থায়ন ও বিনিয়োগ প্রকল্পে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শুধু সহায়তার গ্রহীতা নয়, বরং জলবায়ু কার্যক্রমের অংশীদার ও মালিকানায় যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
পরিবেশবিজ্ঞানে নারীর নেতৃত্ব
সম্মেলনে ‘Women in Environmental Sciences’ শীর্ষক বিশেষ অধিবেশনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়া AUW-এর সাবেক শিক্ষার্থীরা পরিবেশবিজ্ঞানে নারীদের নেতৃত্ব ও তাঁদের গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স, বানারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বেইজিংয়ের সঙ্গে যুক্ত এসব গবেষক পরিবেশবিজ্ঞানে নারীদের নেতৃত্ব, পরামর্শদাতা, আন্তঃপ্রজন্ম সংলাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
গবেষণায় পুরস্কার
সম্মেলনে মৌখিক ও পোস্টার উপস্থাপনায় সেরা গবেষকদের পুরস্কৃত করা হয়।
মৌখিক উপস্থাপনায় সেরা পুরস্কার পান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ-আল-কামাল এবং AUW-এর শিক্ষার্থী আফরা নাওয়ার রহমান।
ড. মাসুদ-আল-কামালের গবেষণার বিষয় ছিল ‘Displacement and Dispossession in Climate Adaptation: Evidence from the Bengal Delta’। অন্যদিকে আফরা নাওয়ার রহমান সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ স্বাস্থ্য ও সমুদ্রের রঙ পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা উপস্থাপন করেন।
এ ছাড়া AUW-এর ড. তুহিন বিশ্বাস ও নাজিফা রাফাকে Best Young Researcher Award এবং শিক্ষার্থী উনুচিং মারমাকে Best Student Volunteer Award দেওয়া হয়।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে অংশগ্রহণকারীরা কক্সবাজারের দুলাহাজারা সাফারি পার্ক ও উপকূলীয় এলাকায় মাঠপর্যায়ের সফরে অংশ নেন।
দুই দিনের সম্মেলনে অংশ নেওয়া গবেষক ও নীতিবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি ও ঝুঁকি সমানভাবে বণ্টিত নয়। ফলে জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে যাঁরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।







