একজন প্রকৌশলী যখন কোনো সেতু, ভবন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, কারখানা কিংবা প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর দিকে তাকান, তখন তাঁর চোখে শুধু ইট-পাথর, লোহা-কংক্রিট কিংবা যন্ত্রপাতি ধরা পড়ে না। তিনি দেখেন মানুষের প্রয়োজন, নিরাপত্তা, স্বপ্ন ও উন্নত ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। এ কারণেই প্রকৌশলী পেশা শুধু একটি চাকরি বা ব্যবসা নয়, এটি দায়িত্বেরও একটি নাম।
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে প্রকৌশলীদের অবদান তাই আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। দেশের অবকাঠামো থেকে শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি; প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রকৌশলীরা নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। আর এই বিশাল প্রকৌশলী সমাজের পেশাগত সংগঠন হিসেবে দ্য ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইবি) দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
চট্টগ্রামের প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ চট্টগ্রাম শুধু একটি শহর নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, নির্মাণকাজ এবং দ্রুত বেড়ে ওঠা নগরজীবন; সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের উন্নয়নের সঙ্গে প্রকৌশলীদের ভূমিকা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—আমরা কেমন IEB চট্টগ্রাম কেন্দ্র চাই? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো প্রত্যেক প্রকৌশলীর কাছে ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু কিছু প্রত্যাশা প্রায় সবারই এক।

প্রয়োজন কার্যকর যোগাযোগ
একজন প্রকৌশলী যখন আইবি’র সদস্য হন, তখন তিনি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সদস্য হন না; তিনি একটি বৃহৎ পেশাজীবী পরিবারের অংশ হয়ে ওঠেন। তাই এই পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দেখা যায়, আইবি’র বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে সব সদস্য সমানভাবে জানতে পারেন না বা অংশ নেওয়ার সুযোগ পান না। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে এই দূরত্ব কমানো খুব কঠিন কিছু নয়।
নিয়মিত অনলাইন যোগাযোগ, প্রশিক্ষণের তথ্য, চাকরির সুযোগ, সেমিনার, স্কলারশিপ, উচ্চশিক্ষা কিংবা পেশাগত উন্নয়নের খবর সহজভাবে সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলে আইবি’র সঙ্গে সদস্যদের সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। কারণ সদস্যরা শুধু একটি কার্ড বা সনদ চান না; তাঁরা চান, প্রয়োজনে আইবি’কে পাশে পাওয়া।
তরুণ প্রকৌশলীদের কথা কি আমরা যথেষ্ট ভাবছি?
তাঁদের চোখে থাকে স্বপ্ন, হাতে থাকে ডিগ্রি। কিন্তু কর্মজীবনের শুরুতে কীভাবে সুযোগ খুঁজতে হয়, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে হয় কিংবা চাকরির বাজারে নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়—সে বিষয়ে অনেকেরই বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকে না।
একজন নতুন প্রকৌশলী হয়তো জানেন না কোন দক্ষতাটি চাকরির বাজারে বেশি প্রয়োজন। কেউ হয়তো ভালো CV তৈরি করতে পারেন না। কেউ ইন্টাভিউর জন্য প্রস্তুত নন। আবার কেউ বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা চাকরির সুযোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পান না। এই জায়গায় IEB চট্টগ্রাম কেন্দ্র অনেক কিছু করতে পারে।
আজকের প্রকৌশলীকে প্রতিদিন নতুন করে শিখতে হচ্ছে
আমরা এমন একটি সময়ে বাস করছি যখন প্রযুক্তি খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবোটিকস, ডেটা অ্যানালিটিকস, সাইবার নিরাপত্তা কিংবা গ্রিন টেকনোলজি—এসব বিষয় এখন আর শুধু বইয়ের অধ্যায় নয়; এগুলো বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অংশ। আজ যে প্রযুক্তি নতুন, কয়েক বছর পর সেটিই হয়তো সাধারণ হয়ে যাবে। তাই প্রকৌশলীদের জন্য ধারাবাহিকভাবে শেখা এখন বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। আইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্র যদি নিয়মিত আধুনিক প্রযুক্তির ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, কারিগরি অধিবেশনের আয়োজন করে, তাহলে সদস্যরা সরাসরি উপকৃত হবেন। বিশেষ করে এমন প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, যা কেবল সনদ দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করবে।
আমাদের সমাজে প্রকৌশলী মানেই চাকরি—এই ধারণাটি ধীরে ধীরে বদলানো প্রয়োজন
একজন প্রকৌশলী চাকরি করতে পারেন আবার উদ্যোক্তাও হতে পারেন। তিনি পরামর্শক সেবা প্রদান করতে পারেন, প্রযুক্তিভিত্তির ব্যবসা করতে পারেন, প্রশিক্ষন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন কিংবা নতুন কোনো প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ শুরু করতে পারেন। চট্টগ্রামে শিল্প ও ব্যবসার যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে প্রকৌশলী উদ্যোক্তাদের জন্যও অনেক সুযোগ আছে।
আইবি’র চট্টগ্রাম কেন্দ্র চাইলে অভিজ্ঞ উদ্যোক্ত এবং তরুণ প্রকৌশরীদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করতে পারে। সফল প্রকৌশলী উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নতুন উদ্যোগের জন্য পেশাগত যোগাযোগ এবং মেনটরশিপের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। একজন প্রকৌশলীকে শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, একজন সম্ভাব্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে দেখার সময় এসেছে।
চট্টগ্রামের দিকে তাকালে একজন প্রকৌশলীর চোখে অনেক প্রশ্ন আসে
জলাবদ্ধতা কেন বারবার ফিরে আসে? নগর পরিকল্পনা কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়? যানজট কীভাবে কমানো যায়? ভবন নির্মাণে নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়? শিল্পাঞ্চলের পরিবেশগত ঝুঁকি কীভাবে কমানো যায়?
এসব প্রশ্নের সমাধান শুধু প্রশাসনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এখানে প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত জ্ঞান প্রয়োজন। আইবি’র চট্টগ্রাম কেন্দ্র এই বিষয়ে একটি পেশাগত ও কারিগরি প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। এজন্য প্রয়োজন আইবি’কে আরও আপন করে তোলা। একজন সদস্যের কাছে একটি সংগঠন তখনই সত্যিকার অর্থে নিজের হয়ে ওঠে, যখন তিনি অনুভব করেন—“এখানে আমার কথা শোনা হয়।”
আমরা এমন একটি আইবি চট্টগ্রাম চাই
যেখানে একজন তরুণ প্রকৌশলী এসে বলবেন, “আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখানে কথা বলার মানুষ আছে।” একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী বলবেন, “আমার অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাজে লাগছে।” একজন চাকরিপ্রার্থী বলবেন, “আমি প্রয়োজনীয় তথ্য ও দিকনির্দেশনা পাচ্ছি।” একজন উদ্যোক্তা বলবেন, “আমি আমার পেশার মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা ও networking-এর সুযোগ পাচ্ছি।” একজন সাধারণ সদস্য বলবেন, “এই প্রতিষ্ঠানটি সত্যিই আমার কথা শোনে।” আর চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ যেন বলতে পারে, “শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশলগত সমস্যাগুলো নিয়ে IEB-এর প্রকৌশলীরা দায়িত্বশীলভাবে কথা বলেন।” এটাই হয়তো একটি আধুনিক পেশাজীবী সংগঠনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
শেষ কথা
সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে প্রযুক্তি, কর্মক্ষেত্র ও প্রকৌশল পেশার চাহিদা। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্রও যদি নতুনভাবে ভাবতে পারে, তবে তার সুফল শুধু প্রকৌশলী সমাজে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উপকৃত হবে চট্টগ্রামসহ বৃহত্তর সমাজ। চট্টগ্রামের প্রকৌশলীদের মেধা, অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনাকে একসূত্রে যুক্ত করাই হতে পারে এই কেন্দ্রের আগামী দিনের বড় শক্তি। এমন একটি সংগঠন, যেখানে তরুণেরা দিকনির্দেশনা পাবেন, অভিজ্ঞেরা তাঁদের জ্ঞান ভাগ করে নেবেন, উদ্যোক্তারা সহযোগিতার সুযোগ পাবেন এবং সদস্যদের মতামত গুরুত্ব পাবে—এটাই সময়ের দাবি। প্রকৌশলীরা শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করেন না; তাঁরা সম্ভাবনার পথও তৈরি করেন। আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্র সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর কার্যকর মঞ্চ হয়ে উঠুক—এটাই প্রকৌশলী সমাজের প্রত্যাশা।
লেখক পরিচিতি: ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইমরান, তিনি আইবির একজন ফেলো (F-15378)। যুক্তরাজ্যের কিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ এবং ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম (IIUC) থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইমরান Imran’s Academy-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান রিসোর্স পারসন। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা ও প্রকৌশল প্রোগ্রামে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সাথে তিনি একজন TESOL সনদপ্রাপ্ত IELTS প্রশিক্ষক এবং ‘Mentors Chittagong’-এর সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন।





