রবিবার – ৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবিবার – ৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ –  ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সবুজের নীল কান্না

সবুজ রঙটি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ। কিন্তু সবুজ পাসপোর্ট হাতে যখন একজন বাংলাদেশি বিদেশের বিমানবন্দরে সন্দেহ, অবহেলা বা অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন, তখন প্রশ্ন ওঠে, এ অপমানের দায় কার? একটি ছোট্ট সবুজ রঙের বইয়ের, নাকি সেই রাষ্ট্রব্যবস্থার, যার প্রতিনিধিত্ব করে এ পাসপোর্ট?

ধরুণ, আপনার বাসায় গ্রাম থেকে যদি কোনো কৃষক অথবা মজুর শ্রেণির কেউ আসে, তাকে কি আপনি ড্রয়িং রুমে বসতে দেবেন অথবা বাসায় বেড়াতে আসা মেহমানের সাথে আসা ড্রাইভারকে কি আপনি ডাইনিং টেবিলে খাওয়া বেড়ে দিবেন, আপনার পছন্দের ক্রোকারিজ দিয়ে? মনে হয় না; তাঁদের জন্য আপানার বাসায় আলাদা ব্যবস্থা আছে।

এটি স্পষ্টত শ্রেণিবৈষম্য, আর এ বৈষম‍্য অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা কিংবা সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে সৃষ্ট। তাই একজন কৃষক, শ্রমিক বা গাড়িচালকের সঙ্গে আমাদের আচরণ আর সম-মর্যাদার কারও সঙ্গে আচরণের মধ্যে অদৃশ্য পার্থক্য থেকে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও অনেকটা এমনই নির্মম। বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের পরিচয়টাও শুধুমাত্র সস্তা শ্রমের একটা দেশ হিসেবে। যে-দেশের শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল, যে দেশে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই দুর্নীতিগ্রস্থ, সেই দেশের মানুষদের উন্নত দেশে ঠিক সেই ব্যাবহারটাই পাবে, যে-রকম ব্যবহার আমরা দেই বাসায় আসা কোনো মজুর শ্রেণির মানুষকে। কেননা সেসব উন্নত দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান ও শিক্ষা আমাদের চেয়ে বেশি তারওপর আপনার বাসায় বেড়াতে আসা ব্যাকটির যদি পূর্বে যদি কোনো অপরাধের ইতিহাস থাকে কিংবা ঘরে এসে যদি থেকে যেতে চাওয়ার প্রবণতা থাকে , তবে তো তাকে ঘরে ঢুকতেই দিবেন না।  এখানে পাসপোটের সবুজ রঙটা কী কোন অর্থ বহন করে? এখানে সবুজ একটা রং ছাড়া আর কিছুই না।

একটি দেশের পাসপোর্ট কতটা শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নয়। বরং অর্থনৈতিক স্থিতি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, অভিবাসন প্রবণতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং নাগরিকদের আন্তর্জাতিক আচরণের ওপরও। কোনো দেশের নাগরিকেরা ভিসার মেয়াদ অতিক্রম করে থেকে যায় কি না, অবৈধ শ্রমবাজারে প্রবেশের হার কত, কিংবা রাষ্ট্রের পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু; এসব বিষয়ও গভীরভাবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ এখন নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে থাকলেও শিক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। দুর্নীতির সূচক, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সীমিত কর্মসংস্থান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করছে। ফলে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হওয়াটা পুরোপুরি অমূলক নয়।

অন্যসব বাদ দিয়ে শুধুমাত্র শিক্ষার বিষয়টি খেয়াল করে দেখুন। ২০২২ সালের ১৭ জুন জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চেভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে’। হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স অনুযায়ী—বিশ্বের ১০১ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশি পাসপোর্টের অবস্থাস ৯৫ তম। তন্মোধ্যে ৩৭ টি দেশে বাংলাদেশি নাগরিকেরা ভিসা ছাড়া কিংবা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা পান। এরমধ্যে চারটি দেশ রয়েছে যারা বাংলাদেশের চেয়ে অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে, বাহামা, বার্বাডোস, সিশেলস ও ত্রিনিদাদ-টোবাগো।  সবগুলোই দ্বীপ রাষ্ট্র, যাদের কঠোর ইমিগ্রেশন পলিসি, অতি উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, চাকরির সুবিধা নেই বলেই চলে। সব মিলিয়ে এসব দেশে মানুষ খুব একটা মাইগ্রেট করতে চায় না। অন্য দিকে বাকি ৩৭ টি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বাংলাদেশের মতো মত কিংবা তার চেয়ে নিচে। সুতরাং এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, খুব সু-চিন্তিতভাবে একটা দেশের পাসপোর্টের মানদণ্ড ঠিক করা হয়। যার সাথে ঐ রাষ্ট্রের নাগরিকদের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় আনা হয়।

আমরা যারা প্রতিনিয়ত সবুজ পাসপোর্টের নিয়ে বিষোদগার করি, তাঁদের জানা উচিত রঙ নয় বরং  এটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তি, সুশাসন, শিক্ষার মান, দক্ষ মানবসম্পদ এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতারই প্রতিফলন। যতদিন পর্যন্ত আমরা দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন প্রবণতা থেকে বের হতে পারব না, ততদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বৈষম্যে থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারবো না।